যুদ্ধ শেষে ‘মনোরম দেশ ইরানে’ ফসল বিক্রি করবেন মার্কিন কৃষকেরা, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ অবসানে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করায় খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা 'মনোরম দেশ ইরানে' তাদের উৎপাদিত গম, সয়াবিন ও ভুট্টা বিক্রি করতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, 'বহু বছর ধরে অন্য দেশগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে আমাদের ঠকিয়েছে। কিন্তু চলতি বছরই আমরা কৃষিপণ্যের বাণিজ্য ঘাটতি ৪২ শতাংশ কমিয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'এবং আমাদের সামনে আরও একটি নতুন বাজার আসছে। আর সেটি মনোরম দেশ ইরান। এটি একটি সুন্দর জায়গা। কেউ কি সেখানে যেতে চান?'
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান খাদ্যের সংকটে ভুগছে। আমরা তাদের কিছু অর্থ নিয়ে তা খরচ করব। আমরা প্রচুর পরিমাণে গম, সয়াবিন ও ভুট্টা কিনব—প্রচুর পরিমাণে। খুব শিগগিরই এই প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। এটি বেশ বড় আকারেই হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি এটি অনেক বড় হবে।'
এর আগে গত মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একই ধরনের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, যুদ্ধের কারণে ইরান এখন 'মানবিক সংকটের' মুখোমুখি। তাই তিনি ইরানি সম্পদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন এবং 'একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনার জন্য' আটকে থাকা তহবিল অবমুক্ত করবেন।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের করা অন্যান্য বক্তব্যের মতো তার এই দাবিকেও দ্রুত নাকচ করে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত কড়া ভাষায় এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, 'এটি বেশ কৌতূহল উদ্দীপক যে, যুদ্ধের দর্শন ও মূল লক্ষ্য যেখানে ছিল ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করা এবং ইরানের পতন ঘটানো, তা এখন মার্কিন কৃষকদের সমৃদ্ধ করার উপায়ে পরিণত হয়েছে।'
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, 'আমেরিকা মিথ্যা দাবি করছে যে আমাদের অবমুক্ত করা সম্পদ দিয়ে তাদের কৃষিপণ্য কেনা হবে।'
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, আমাদের অবমুক্ত অর্থ দিয়ে তাদের কৃষিপণ্য কিনতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা শুধু সেই ফসলই কাটছি, যা আপনারা দশকের পর দশক ধরে অবিশ্বাসের বীজ বুনে তৈরি করেছেন। আপনারা রপ্তানি করেন শুধু জিএমও সয়াবিন, ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি আর কটূক্তি।'
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই মার্কিন কৃষি খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের 'পারস্পরিক শুল্ক নীতি' মার্কিন কৃষিপণ্য রপ্তানির চাহিদা কমিয়ে দেয় এবং দাম হ্রাস করে। ফলে গত ডিসেম্বর মাসে কৃষকদের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের বেলআউট বা জরুরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
তবে নিজের নীতির কারণে সৃষ্ট এই ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার না করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বভাবসুলভভাবে তার পূর্বসূরি জো বাইডেনকে দায়ী করেন। ট্রাম্পের দাবি, বাইডেন 'আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ওপর পঙ্গুত্বকারী বিধিনিষেধ' দিয়ে কৃষকদের ধ্বংস করেছেন।
এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ২৮ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিতে হয়েছিল।
এ বছর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার ও জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে মার্কিন কৃষিতেও। এরপরও মার্চের শেষ দিকে কৃষকদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, 'তারা অনুদান চান না।'
চলতি মাসে উইসকনসিনের চিপেওয়া ফলসে কৃষকদের সঙ্গে এক গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন ট্রাম্প। সেখানে কৃষি ইস্যুর বদলে তিনি লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের ছবি দেখাতে ব্যস্ত ছিলেন। পরে ওই প্রকল্পটি সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ পানির রং জলাভূমির মতো সবুজ হয়ে যায়।
অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানও কৃষি খাতে শ্রমিকসংকট তৈরি করে। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা কৃষিশ্রমিকদের জন্য 'কোনো সাধারণ ক্ষমা' থাকবে না। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কৃষিশ্রমিকদের প্রায় ৪২ শতাংশই এই শ্রেণিতে পড়তেন।
খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দিলে প্রায় নয় মাস পর প্রশাসন অবস্থান পরিবর্তন করে। কৃষিখাতে অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগ সহজ করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসনবিরোধী সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ জোগাতে ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে কংগ্রেসের কাছে আরও ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাচ্ছে
