পেরুর ক্ষমতায় সাবেক ‘স্বৈরশাসক' ফুজিমোরির মেয়ে কেইকো
কৈশোরে কেইকো ফুজিমোরি তার বাবা আলবার্তো ফুজিমোরির 'ফার্স্ট লেডি' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কঠোর শাসনের জন্য পরিচিত আলবার্তো ফুজিমোরি পরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন। এখন কন্যা কেইকোও বাবার পথ অনুসরণ করে পেরুর প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। তিনি লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতায় আসা ডানপন্থী নেতাদের অন্যতম।
বাবার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবে কেইকোর বিজয় পেরুর জনগণের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, তেমনি উদ্বেগও বাড়িয়েছে। কারণ অনেকেই এখনো ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আলবার্তো ফুজিমোরির শাসনামলের কথা মনে রেখেছেন। সে সময় তিনি একদিকে নিষ্ঠুর মাওবাদী বিদ্রোহ দমন এবং ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হন, অন্যদিকে ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তার সরকারের পতন ঘটে।
৫১ বছর বয়সী কেইকো ফুজিমোরিও বাবার মতো আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতির সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের আঞ্চলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি সহিংস অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বর্তমানে চাঁদাবাজি, অবৈধ স্বর্ণখনি কার্যক্রম এবং কোকেন পাচার বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন পেরুর জনগণের কাছে এটি বড় একটি ইস্যু।
তিনি সর্বোচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন কারাগার নির্মাণ, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বিচারকদের পরিচয় গোপন রাখতে হুড পরার অনুমতি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
নির্বাচনি প্রচারণার সময় কেইকো বলেছিলেন, 'বিচারব্যবস্থা ভয় পাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপরাধীদের মোকাবিলায় শক্তি প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা। এই নিকৃষ্ট লোকগুলো আমাদের হত্যা করছে।'
গত রোববারের রান-অফ নির্বাচনে ৯৮ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, কেইকো তার বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী রবার্তো সানচেজকে সামান্য ব্যবধানে হারিয়েছেন। প্রায় দুই কোটি ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৫০.০০২ শতাংশ ভোট—প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তার ব্যবধান মাত্র কয়েকশো ভোটের। ভোট বিশ্লেষকদের মতে, অবশিষ্ট ভোটগুলো কেইকোর পক্ষেই যাবে এবং এই সামান্য ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।
এর মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে নির্বাচিত ডানপন্থী নেতাদের ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীতে যোগ দিচ্ছেন। বর্তমানে শুধু উরুগুয়ে, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলে মধ্য-বামপন্থী সরকার রয়েছে। তবে কলম্বিয়া ও ব্রাজিল—উভয় দেশেই সামনে নির্বাচন রয়েছে, যেখানে ডানপন্থী প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা জোরালো।
উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টার-আমেরিকান ডায়ালগের সাবেক সভাপতি মাইকেল শিফটার বলেন, 'ট্রাম্প প্রশাসন এখন বলতে পারে, আমাদের শিবিরে আরেকজন যোগ হলো।'
তবে কেইকো যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তা ১৯৯০ সালে তার বাবার হাতে আসা পেরুর চেয়ে অনেক ভিন্ন। তাকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম অকার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিতে হবে। গত এক দশকে দেশটির এটি হবে দশম প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী নেত্রী হিসেবে কেইকোর কঠোর রাজনৈতিক কৌশলও এ অস্থিরতার জন্য আংশিক দায়ী।
জনপ্রিয়তার দিক থেকেও তিনি বাবার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। অতীতে তিনবার নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর এবারও খুব অল্প ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।
ইপসোস পেরুর প্রধান আলফ্রেদো তোরেস বলেন, 'তার জন্য সরকার পরিচালনা কঠিন হবে। খুব সামান্য ব্যবধানে জয় পাওয়ায় তাকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে।'
অন্যদিকে রবার্তো সানচেজ এখনো পরাজয় স্বীকার করেননি। তার কয়েকজন মিত্র কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। সানচেজ জানিয়েছেন, তিনি তার 'জনগণের বিজয়' রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাবেন।
তবে জুনিয়র ফুজিমোরি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তার বাবার থেকে আলাদা। আলবার্তো ফুজিমোরি ছিলেন রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের একজন ব্যক্তি, যিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিরক্ত দরিদ্র জনগণের সমর্থন নিয়ে ১৯৯০ সালে ক্ষমতায় আসেন। বিপরীতে তার মেয়ে আজ লিমাভিত্তিক রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির অন্যতম মুখ।
মিত্রদের মতে, বাবার স্বাভাবিক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব না থাকলেও কেইকো তার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা অনুসরণ করেন না। আলবার্তো ফুজিমোরি কংগ্রেস ভেঙে দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার করেছিলেন এবং ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। তার বিরোধী ও বহু ইতিহাসবিদ তাকে স্বৈরশাসক বলে অভিহিত করেছেন।
তবে কেইকো দাবি করেছেন, পেরুর এক মেয়াদি প্রেসিডেন্টসীমা অতিক্রম করে ক্ষমতায় থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
তার পপুলার ফোর্স পার্টির সদস্য এবং কংগ্রেসের প্রধান বলেন, 'তিনি কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করবেন—এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক হিসেবে প্রমাণ করেছেন।'
পেরুর জটিল রাজনৈতিক অঙ্গনে কেইকোর প্রবেশ ঘটে ১৯৯৪ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় কেইকোকে বাবা-মায়ের তিক্ত ও বহুল আলোচিত বিচ্ছেদের সময় 'ফার্স্ট লেডি' হিসেবে নিয়োগ দেন তার বাবা।
তার মা সুসানা হিগুচি আলবার্তো ফুজিমোরিকে 'দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসক' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। পেরুর মানুষকে টেলিনভেলার মতো আকৃষ্ট করা সেই কেলেঙ্কারিতে প্রেসিডেন্ট তার স্ত্রীর সরকারি বাসভবনের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং তাকে ভবনে প্রবেশেও বাধা দেন।
পরে 'ফুজিমোরিসমো' নামে পরিচিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে নিজস্ব রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন কেইকো। ২০০৬ সালে তিনি কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন এবং এরপর প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতে থাকেন। কিন্তু তিনবারই পরাজিত হন, যার মধ্যে দুইবার ব্যবধান ছিল অত্যন্ত সামান্য।
তিনি দ্রুতই বুঝতে পারেন, তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ—পারিবারিক নাম—একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দায়ও। 'অ্যান্টি-ফুজিমোরিসমো' নামে পরিচিত একটি শিথিল জোট বারবার বামপন্থী রাজনীতিক, মধ্যপন্থী উদারপন্থী এবং গণতন্ত্রপন্থী কর্মীদের একত্র করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমর্থন দেয়।
২০১৬ সালের নির্বাচনে কেইকো তার আন্দোলনের কর্তৃত্ববাদী অতীত থেকে দূরত্ব তৈরি করে আরও মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অল্প ব্যবধানে তিনি পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কির কাছে পরাজিত হন। সেসময় কুচিনস্কি বলেছিলেন, কেইকোর বিজয় পেরুকে 'মাদকরাষ্ট্রে' পরিণত করবে।
পরবর্তীতে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে কেইকো কুচিনস্কির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত অভিশংসন এড়াতে কুচিনস্কি পদত্যাগ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই রাজনৈতিক সংঘাতই পেরুর বর্তমান দশকের অস্থিরতার সূচনা করে। এতে সংবিধানের 'নৈতিক অযোগ্যতা' ধারা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যার মাধ্যমে আইনপ্রণেতারা দ্রুত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করতে পারেন।
২০১৮ সালে ব্রাজিলীয় নির্মাণ জায়ান্ট ওডেব্রেখটকে ঘিরে বৃহৎ দুর্নীতি তদন্তের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার হন কেইকো ফুজিমোরি। হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অবৈধ নির্বাচনি অনুদান গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন বলে বর্ণনা করেন। গত বছর পেরুর সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির মামলা খারিজ করে দেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, তিনি এমন একটি ডানপন্থী কংগ্রেসীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা পেরুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, সংঘবদ্ধ অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা কমিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থায় নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসিয়েছে।
