পেরুর নাসকা লাইনসের কাছে পর্যটকবাহী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, নিহত ১৩
পেরুর বিশ্বখ্যাত নাসকা লাইনসের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি পর্যটকবাহী উড়োজাহাজ একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে উড়োজাহাজে থাকা ১৩ জনই নিহত হয়েছেন।
শনিবার উড়োজাহাজটি মরুভূমিতে খোদাই করা প্রাচীন ভূ-রেখাচিত্রের (জিওগ্লিফ) এলাকার কাছাকাছি বিধ্বস্ত হয়। পর্যটকদের কাছে এ রেখাচিত্রটি দেশটির অন্যতম বড় আকর্ষণ। আর এটি আকাশ থেকেই সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়।
উড়োজাহাজটি কেন বিধ্বস্ত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পেরুর পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১টার কিছু পরে উড়োজাহাজটি সোকোস শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ক্রুরা নাসকা উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে জরুরি অবস্থার বার্তা পাঠিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই উড়োজাহাজটির সঙ্গে বেতার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
দুইজন ক্রু সদস্য এবং ১১ জন যাত্রী নিয়ে সেসনা ক্যারাভান সি–২০৮ মডেলের উড়োজাহাজটি প্রায় ৫০ মিনিট আগে পিসকো বিমানবন্দর থেকে উড়ে গিয়েছিল। যাত্রীদের মধ্যে সাতজন ইতালির, দুজন জার্মানির এবং দুজন স্পেনের নাগরিক ছিলেন।
উড়োজাহাজটি যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছে, সেই ভিস্তা আলেগ্রে এলাকার পৌর কর্তৃপক্ষ বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে যে উড্ডয়নের সময়ই একটি জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
শহরটির এক বাসিন্দা জানান, মাটিতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই উড়োজাহাজটি বিস্ফোরিত হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা যায়, ছোট আকারের উড়োজাহাজটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর বিভিন্ন অংশ মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এদিকে দমকলকর্মীরা ধ্বংসাবশেষে জ্বলতে থাকা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন।
উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অ্যারোডিয়ানা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'নাসকা রেখা এলাকায় পর্যটকদের নিয়ে পরিচালিত আকাশপথ ভ্রমণের সময় আজ যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি।'
পেরুর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কাইকো ফুজিমোরি বলেছেন, সরকার পিসকো বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করবে। এই বিমানবন্দর থেকেই প্রতিদিন নাসকা রেখা দেখানোর উদ্দেশ্যে বহু পর্যটকবাহী উড়োজাহাজ উড়ে যায়।
পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য, দমকল বাহিনীর সদস্য এবং বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল অধিদপ্তরের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। তারা নিশ্চিত করেছেন যে দুর্ঘটনায় কেউ বেঁচে নেই।
পুলিশের মেজর হোর্হে আন্দ্রাদে সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল অধিদপ্তর এবং উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তদন্ত কমিশন এ ঘটনার তদন্ত শুরু করবে।
গত ১৮ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা অ্যারোডিয়ানা জানিয়েছে, দুর্ঘটনা সম্পর্কে তারা শিগগিরই আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে।
প্রতিষ্ঠানটি ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টাব্যাপী আকাশপথে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে থাকে। নাসকা রেখার ওপর দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি একটি। এই সেবা মূলত বিদেশি পর্যটকদের জন্য পরিচালিত হয়।
জ্যামিতিক নানা আকৃতি এবং বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বে ভরা বিস্তীর্ণ এই এলাকাটি কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, সেই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সাল থেকে খ্রিষ্টীয় ৫০০ সালের মধ্যে তৈরি হওয়া এই রেখাগুলো ধর্মীয় আচার এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। ১৯৯৪ সালে সংস্থাটি এই স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
অ্যারোডিয়ানার ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা, সেবার মান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উচ্চমান বজায় রাখে।
তবে কোম্পানির ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত ট্রিপঅ্যাডভাইজারের একটি পাঁচ-তারকা পর্যালোচনাতে বলা হয়েছে যে তাদের অভিজ্ঞতাটি "স্বাভাবিক উড্ডয়ন ছিল না", এবং এতে "চরম ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল" অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, 'এটি নাসকা রেখা দেখার জন্য কোনো সাধারণ উড়োজাহাজ ভ্রমণ নয়। প্রথম রেখার কাছে পৌঁছানোর পরই ডান ও বাম দিকের দৃশ্য দেখানোর জন্য কিছু অত্যন্ত তীব্র কৌশলগত বাঁকের জন্য প্রস্তুত থাকুন। ভ্রমণটি বেশ রোমাঞ্চকর, তবে আপনি যদি এমন তীব্র নড়াচড়া উপভোগ করতে পারেন, তাহলে সেটি অবশ্যই সার্থক।'
আরেকজন পর্যালোচক লিখেছেন, তাদের ভ্রমণ ভালো ছিল এবং উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছিল।
নাসকা রেখার আশপাশে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে কয়েকটি আলোচিত দুর্ঘটনা ঘটেছে।
২০২২ সালে একটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন চিলির এবং তিনজন নেদারল্যান্ডসের নাগরিক ছিলেন।
এ ছাড়া ২০১০ সালের অক্টোবরে এয়ারনাসকার একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে চারজন ব্রিটিশ পর্যটক এবং পেরুর দুইজন ক্রু সদস্য নিহত হন।
