ভারতের করপোরেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি! ১৫৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের ভুয়া তথ্য
ভারতের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রাজেশ এক্সপোর্টস-এর বিরুদ্ধে পরিচালিত আনুষ্ঠানিক এক তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কোম্পানিটি তাদের সুইজারল্যান্ডভিত্তিক রিফাইনিং ইউনিট 'ভালকাম্বি'-এর আয় প্রায় ১৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাড়িয়ে দেখিয়েছে। দেশটির করপোরেট হিসাব সংক্রান্ত তদন্তের ইতিহাসে—এত বড় অংকের জালিয়াতির ঘটনা এর আগে কখনো শোনা যায়নি।
গত বুধবার ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা– সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড (সেবি) এই তদন্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। এই বিশাল আর্থিক অসঙ্গতির তথ্য ভারতের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী এবং বাজার বিশ্লেষকদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত যখন ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা জায়ান্ট 'এলআইসি'-র মতো কোম্পানি এই প্রতিষ্ঠানের ১১ শতাংশ শেয়ারধারী, সেখানে কীভাবে এই বিষয়টি সবার নজর এড়িয়ে গেল, তা নিয়ে বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
রাজেশ এক্সপোর্টস এই অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। গত শুক্রবার স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি বলেছে, "কোম্পানির আয়ের হিসাবের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।" তবে এই বিষয়ে জানতে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এলআইসি তাতে সাড়া দেয়নি।
ভালকাম্বি কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা জানায় যে, নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই অভিযোগ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
ভারতের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড (সেবি)-এর প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো:
আয়ের তথ্য বাড়িয়ে দেখানো এবং ভালকাম্বি
মূল্যবান ধাতু পরিশোধনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রিফাইনারি ভালকাম্বি-র মালিকানা এর আগে 'ইউরোপিয়ান গোল্ড রিফাইনারিজ'-এর কাছে ছিল। ২০১৫ সালে সম্পূর্ণ নগদ অর্থের বিনিময়ে এক চুক্তির মাধ্যমে রাজেশ এক্সপোর্টস এটি কিনে নেয়।
সেবি জানিয়েছে, রাজেশ এক্সপোর্টস ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে ভারতে তাদের প্রতিবেদনে আয়ের পরিমাণ প্রায় ১৫.১৫ ট্রিলিয়ন রুপি (১৫৮.৯৩ বিলিয়ন ডলার) বাড়িয়ে দেখিয়েছে। সেবি আরও জানায়, এই গ্রুপের মূল পরিচালক কর্তৃপক্ষ ভালকাম্বি-র অ্যাকাউন্ট থেকেই কোম্পানির প্রায় সমস্ত আয় দেখানো হয়েছে। অথচ এককভাবে ভালকাম্বি-এর নিজস্ব আর্থিক বিবরণীতে বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার।
ভালকাম্বি-র আয় এবং ভারতের মূল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবের মধ্যে থাকা এই বিপুল পার্থক্যের বিষয়ে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর চেয়ারম্যান রাজেশ মেহতা সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে রয়টার্সের কাছে তিনি দাবি করেছেন, তাদের সমস্ত আর্থিক ঘোষণা সঠিক ছিল।
মেহতা বলেন, "সেবির সাথে আমাদের কিছু ভুল বোঝাবুঝি এবং তথ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমাদের আর্থিক হিসাব একদম নিখুঁত। সেবির তদন্তের ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করে যাব।"
রাজেশ এক্সপোর্টস মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি এবং সেবি-র এই আদেশের পর তাদের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ পড়ে গেছে।
রাজেশ এক্সপোর্টসের আসল ব্যবসা কী?
১৯৮৯ সালে বেঙ্গালুরুতে রাজেশ মেহতা এবং তাঁর ভাই মিলে রাজেশ এক্সপোর্টস প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে এটি বিশ্বের ১২টি দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং স্বর্ণ শোধন থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রয় (রিটেইলিং) পর্যন্ত পুরো চেইনে নিজেদের "স্বর্ণ ব্যবসার বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান" হিসেবে দাবি করে।
২০১৫ সালে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ভালকাম্বি-কে অধিগ্রহণ করার পর কোম্পানিটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
আফ্রিকায় সোনার খনি!
সেবি তাদের তদন্তে অভিযোগ করেছে, রাজেশ এক্সপোর্টস ভারতের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে দেওয়া তথ্যে জানায়, তারা আফ্রিকার সোনার খনিতে ১০.৩৫ বিলিয়ন (১,০৩৫ কোটি) রুপি বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সেবি-র আদেশ অনুযায়ী, এই কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক বিবরণী পরীক্ষা করে "আফ্রিকার সোনার খনিতে উল্লিখিত বিনিয়োগের অস্তিত্ব প্রমাণ করার মতো কোনো সহায়ক বা প্রাসঙ্গিক নথিপত্র" পাওয়া যায়নি।
তবে সেবি-র তদন্ত আদেশে দেখা গেছে, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাজেশ এক্সপোর্টস দাবি করে যে তাদের বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সোনার খনিতে এই বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং বিনিয়োগের এই অংকগুলো "সম্পূর্ণ সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ।"
ভুয়া লেনদেন
সেবি আরও জানিয়েছে, রাজেশ এক্সপোর্টস স্থানীয় এক ব্রোকারের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে "কাল্পনিক বা ভুয়া আয়" নথিভুক্ত করেছে। কোনো প্রকৃত লেনদেন বা ব্যাংকিং যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও— এতে ১১৪ বিলিয়ন রুপিরও বেশি অর্থ ক্রয়-বিক্রয় হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
২০২৪ সালে এক শেয়ারহোল্ডারের পক্ষ থেকে বড় অংকের বকেয়া পাওনা সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পর সেবি এই কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, এই জালিয়াতি খতিয়ে দেখতে সেবি একজন ফরেনসিক অডিটর নিয়োগ করেছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও দলিলের অভাবে, তিনি কোম্পানির প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাবের মাত্র সামান্য একটি অংশই যাচাই করতে পেরেছেন।
