চীনে ভাইরাল ‘রাখালের চাকরির বিজ্ঞাপন’: সামনে এলো শ্রমবাজারের সংকট
মঙ্গোলিয়ার দক্ষিণের দুর্গম ও প্রত্যন্ত তৃণভূমিতে রাখাল চেয়ে বিজ্ঞাপনের পোস্ট দেন চীনা খামারমালিক জুও শিয়াওইয়ং। তার সে বিজ্ঞাপনটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সেদিনের সবচেয়ে আলোচিত পোস্টে পরিণত হয়। তার এ সামান্য পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় বিস্মিত হন তিনি।
দুটি পদের জন্য ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ আবেদন করেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন সাংহাই ও চংকিংয়ের বড় শহরের অফিসকর্মী, চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের কারখানার শ্রমিক এবং এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণরাও।
এপ্রিলের শেষ দিকে জুওর দেওয়া ওই চাকরির বিজ্ঞাপনটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ওয়েইবো'-তে পাঁচ কোটি ৯০ লাখ বার দেখা হয়। এটি 'এক্স'-এর চীনা সংস্করণ হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিজ্ঞাপনটি নিয়ে ২১ হাজারেরও বেশি আলোচনা শুরু হয়।
এ ঘটনা দেশটির চাকরির বাজারে বাড়তে থাকা চাপের চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জুও বলেন, 'আমি ভাবতেই পারিনি এটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।' তিনি জানান, আবেদনকারীদের প্রায় দশভাগের একভাগ সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছেন। অন্যদের কেউ ঋণের চাপে আছেন, কেউ কঠোর শিল্পকারখানার কাজে ক্লান্ত, আবার কেউ কর্মস্থলের রাজনীতিতে অতিষ্ঠ।
তিনি বলেন, 'মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।'
কঠিন প্রতিযোগিতা, কম সুবিধার চাকরির বাজার
চীনে সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার পাঁচ শতাংশের সামান্য বেশি থাকলেও, পর্যাপ্ত কাজ না পাওয়ার সমস্যা বাড়ছে। গত এক দশকের বেশিরভাগ সময়ে বেসরকারি খাতের আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় পিছিয়ে ছিল।
নীল কলার বা কারখানার শ্রমিক এবং সাদা কলার বা দাপ্তরিক কর্মী—উভয় ধরনের কর্মীরাই অভিযোগ করেন তথাকথিত '৯৯৬' সংস্কৃতি নিয়ে, যেখানে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে হয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আগামী কয়েক মাসে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ, ইরান যুদ্ধের কারণে কারখানাগুলোর ব্যয় বেড়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং এ গ্রীষ্মে রেকর্ড এক কোটি ২৭ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করবেন।
আইএনজির প্রধান চীন অর্থনীতিবিদ লিন সং বলেন, জুওর বিজ্ঞাপনের প্রতি মানুষের এমন প্রতিক্রিয়া 'একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রায়ই কম সুবিধাসম্পন্ন চাকরির বাজারের প্রতীক।'
তিনি বলেন, 'শহরের চাকরিগুলো এখন কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এবং সেগুলোও ক্রমশ কমে যাচ্ছে।'
চীনের পাঁচ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকটাই রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনকারীরা বিশ্ববাজারে অংশীদারিত্ব বাড়াতে মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর পড়ছে।
জেমস গুও নামের এক তরুণ এই চাকরির জন্য আবেদন করেন, কারণ তিনি পণ্যবাহী কনটেইনার তৈরির কারখানার কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
২১ বছর বয়সী ওই তরুণ বলেন, '১৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করা কেমন, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। স্ক্রু লাগাতে লাগাতে হাত ফুলে যায়, ফোসকা পড়ে যায়, এমনকি শৌচাগারে যাওয়ারও সময় পাওয়া যায় না।'
তিনি বলেন, 'কাজের চাপ এত বেশি যে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।'
জুও এমন রাখাল খুঁজছিলেন, সম্ভব হলে স্বামী-স্ত্রী, যারা গ্রীষ্মকালে ২ হাজার হেক্টর তৃণভূমিতে ৩ হাজার ভেড়া চরাবেন। শীতকালে, যখন তাপমাত্রা শূন্যের নিচে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, তখন তাদের কঠোর পরিশ্রম করে ঘরের ভেতরে পশুদের খাবার দেওয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হবে।
এই কাজের জন্য প্রত্যেক রাখালকে মাসে ৮ হাজার ইউয়ান করে বেতন দেওয়া হবে, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শহরে গড় আয়ের প্রায় ছয় হাজার ইউয়ানের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি তাদের থাকার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে।
চায়না মার্কেট রিসার্চ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শন রেইন বলেন, সাংহাইয়ের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শিক্ষার্থীরাও প্রায় একই বেতন পান। কিন্তু সেই আয়ের বেশিরভাগই ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে শেষ হয়ে যায়।
জুও, যার আরও ২০০টি গবাদিপশু রয়েছে, বলেন এই বেতন কাজের কষ্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, 'বেতন বেশি, কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন কি না এবং শীত পার করতে পারবেন কি না, সেটাই আসল বিষয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি কোনো ভ্রমণ নয়।'
'৩৫ বছরের অভিশাপ'
জুও জানান, আবেদনকারীদের অর্ধেকই ১৯৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া মানুষ। চীনা কর্মীদের ভাষায় এই বয়সগোষ্ঠী '৩৫ বছরের অভিশাপ'-এর কেন্দ্রে রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি খাতসহ অধিকাংশ নিয়োগদাতা ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের এড়িয়ে চলেন।
ওয়েলিংটনের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ক্রিশ্চিয়ান ইয়াও বলেন, 'আমরা দেখছি প্রযুক্তিখাতের কৌতুক হিসেবে পরিচিত "৩৫ বছরের অভিশাপ" এখন বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।'
ই-কমার্স খাতের ২৮ বছর বয়সী এক নারী কর্মী, যিনি গোপনীয়তার জন্য শুধু নিজের পদবি "উ" প্রকাশ করেছেন, মাসে ১০ হাজার ইউয়ান আয় করেন। তবুও রাখালের চাকরিটি তার আগ্রহ জাগিয়েছে।
উ বলেন, 'আমি শহুরে জীবন থেকে পালাতে চাই এবং নানা ধরনের কঠিন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করতে চাই।'
তিনি বলেন, 'আমি পৃথিবী থেকে দূরে শান্ত ও নিরিবিলি জীবন উপভোগ করতে পারতাম।'
শেষ পর্যন্ত জুও চারজন রাখাল নিয়োগ দেন—দুটি দম্পতি—যাদের সবাই ১৯৮০-এর দশকে জন্মেছেন এবং আগে খামারে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল।
যদিও তিনি আরও ৪০টি দম্পতিকে সম্ভাব্য তালিকায় রেখেছেন, তবুও তিনি জানান, অবিবাহিত বা শহরের তরুণদের তিনি আর বিবেচনা করবেন না।
জুও বলেন, 'আমাদের এখানে এমনও হতে পারে যে পুরো এক বছরেও মানুষের দেখা পাবেন না।'
তিনি আরও বলেন, 'কেউ এমন নিঃসঙ্গতা সহ্য করতে পারবে কি না, আমি জানি না।'
