ইরান যুদ্ধের তিন মাস: ট্রাম্প কি পরাজয়ের পথে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয়ে হতে পারতেন, কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিকের ওপর হামলার তিন মাস পর তিনি এখন এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি: তিনি কি যুদ্ধে হারছেন?
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা, পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় দিতে তেহরানের অনীহা এবং তাদের ধর্মতান্ত্রিক সরকার মূলত অক্ষত থাকায় ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীর কৌশলগত সাফল্যগুলোকে একটি গ্রহণযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের বিজয়ের দাবিগুলো এখন অন্তঃসারশূন্য মনে হচ্ছে। বর্তমানে দুই পক্ষই একদিকে অনিশ্চিত কূটনীতি এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের আবার হামলা চালানোর ঘনঘন হুমকির মাঝখানে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। হামলা ফের শুরু হলে পুরো অঞ্চলে ইরানের পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়া নিশ্চিত।
ট্রাম্প এখন এমন এক ঝুঁকির মুখে আছেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার উপসাগরীয় আরব মিত্ররা এই সংঘাত থেকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বের হতে পারে। অন্যদিকে ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করে শেষ পর্যন্ত দরকষাকষিতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে।
সংকটটি এখনও শেষ হয়নি এবং কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন ট্রাম্প এখনও মুখ রক্ষা করার মতো কোনো পথ খুঁজে পেতে পারেন যদি আলোচনা তার পক্ষে যায়। তবে অন্যরা ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ-পরবর্তী এক অন্ধকার ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, "আমরা তিন মাস পার করেছি এবং দেখে মনে হচ্ছে যে যুদ্ধটি ট্রাম্পের জন্য একটি খুব সহজ জয় হওয়ার কথা ছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হচ্ছে।"
ট্রাম্পের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে 'পরাজিত' হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিষয়ে তার চিরচেনা সংবেদনশীলতার কারণে—যা তিনি প্রায়ই তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি কটুকাটব্য হিসেবে ব্যবহার করেন। ইরান সংকটে তিনি নিজেকে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দেখছেন যাকে মোকাবিলা করছে এমন এক দ্বিতীয় সারির শক্তি যারা দৃশ্যত বিশ্বাস করে যে বর্তমানে পাল্লা তাদের দিকেই ভারী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ট্রাম্পকে আরও জেদি করে তুলতে পারে। তিনি হয়তো এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হবেন না যা তার কঠোর অবস্থান থেকে পিছু হটা মনে হয় কিংবা ওবামা আমলের ২০১৫ সালের সেই পরমাণু চুক্তির পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয়, যা তিনি তার প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে তাদের সমস্ত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে বা তার চেয়েও বেশি করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব কার্ড রয়েছে এবং তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে সব বিকল্প টেবিলে খোলা রাখছেন।"
চাপ ও হতাশা
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণায় অপ্রয়োজনীয় সামরিক হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তিনি এমন এক জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন যা তার পররাষ্ট্রনীতির রেকর্ড এবং বিদেশের মাটিতে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতার স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এই নিরবচ্ছিন্ন অচলাবস্থা এমন সময়ে চলছে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ জ্বালানি তেলের দাম এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের জনপ্রিয়তার ধস নিয়ে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে আছেন। তার রিপাবলিকান পার্টি বর্তমানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
ফলস্বরূপ, যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহ পার হওয়ার পর বিশ্লেষকরা মনে করেন ট্রাম্প এখন দুটি কঠিন বিকল্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন: হয় একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি মেনে নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে আসা, না হয় সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে আরও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ঝুঁকি নেওয়া। কূটনীতি যদি ব্যর্থ হয়, তবে তার সামনে একটি পথ হতে পারে ইরানের ওপর সীমিত কিন্তু প্রচণ্ড কিছু হামলা চালিয়ে সেটিকে 'চূড়ান্ত বিজয়' হিসেবে প্রচার করে বিষয়টি শেষ করা।
বিশ্লেষকদের মতে, আরেকটি সম্ভাবনা হলো ট্রাম্প তার দেওয়া ইঙ্গিত অনুযায়ী মনোযোগ কিউবার দিকে সরিয়ে নিতে পারেন, যাতে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু বদলে দিয়ে একটি সহজ বিজয় পাওয়া যায়। যদি তাই হয়, তবে তিনি হয়তো হাভানার চ্যালেঞ্জগুলো মূল্যায়ন করতে ভুল করবেন, ঠিক যেমন তার কিছু সহযোগী ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে তিনি ভুলবশত ভেবেছিলেন ইরানের অপারেশনটি ৩ জানুয়ারির ভেনেজুয়েলা অভিযানের মতোই হবে, যেখানে দেশটির প্রেসিডেন্টকে বন্দি করে ক্ষমতা বদল করা হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের সমর্থকদের অভাব নেই। তার প্রথম মেয়াদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং বর্তমানে আমেরিকান গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের সিইও আলেকজান্ডার গ্রে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে ট্রাম্পের ইরান অভিযান সংকটে আছে। তিনি বলেন, ইরানি সামরিক সক্ষমতায় প্রচণ্ড আঘাত হানা নিজেই একটি "কৌশলগত সাফল্য।" তার মতে, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে চীন থেকে দূরে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছে নিয়ে এসেছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনও নির্ধারণ হওয়া বাকি।
তবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় ট্রাম্পের হতাশার লক্ষণ স্পষ্ট। তিনি তার সমালোচকদের ওপর চড়াও হয়েছেন এবং সংবাদমাধ্যমকে "দেশদ্রোহিতার" দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সাথে মিলে যুদ্ধ শুরুর পর সংঘাতটি ট্রাম্পের দেওয়া সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহের সময়সীমার চেয়ে দ্বিগুণ সময় ধরে চলছে। যদিও তার 'মাগা' রাজনৈতিক ভিত্তি যুদ্ধের পক্ষে অটল রয়েছে, তবে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একসময়ের সর্বসম্মত সমর্থনে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে।
শুরুতে কয়েক দফা বিমান হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয় এবং অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হন। কিন্তু তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে এর জবাব দেয়, যা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। ট্রাম্প তখন ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিলেও তা তেহরানকে মাথা নত করাতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের নেতারাও ট্রাম্পের বিজয়বার্তার পাল্টা প্রচারণা হিসেবে তার অভিযানকে একটি "চরম পরাজয়" হিসেবে চিত্রিত করছেন।
অর্জিত হয়নি লক্ষ্যমাত্রা
ট্রাম্প বলেছিলেন তার এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের পথ বন্ধ করা, অঞ্চল ও মার্কিন স্বার্থের ওপর তাদের হুমকির অবসান ঘটানো এবং ইরানি জনগণের জন্য তাদের শাসকদের উৎখাত করা সহজ করা। কিন্তু তার এই ঘনঘন পরিবর্তনশীল লক্ষ্যগুলো অর্জিত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই এবং অনেক বিশ্লেষক মনে করেন তা হওয়া সম্ভবও নয়।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, ইরান বড় ধরনের আঘাত পেলেও দেশটির শাসকরা মনে করেন স্রেফ মার্কিন হামলা থেকে টিকে থাকাটাই তাদের সাফল্য। তারা এখন জানে যে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে তারা তেমন কোনো শাস্তি ছাড়াই বিশ্বকে চাপে রাখতে পারে। বর্তমানে 'আটলান্টিক কাউন্সিল'-এ কর্মরত প্যানিকফ আরও বলেন, ইরান আত্মবিশ্বাসী যে তারা ট্রাম্পের চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা রাখে এবং তার বিদায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে।
ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য—ইরানের নিরস্ত্রীকরণ—এখনও অপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, যা পুনরায় উদ্ধার করে বোমা তৈরির গ্রেডে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইরান বলছে, তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিক।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে রয়টার্সকে দুইজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা একটি নির্দেশনা দিয়েছেন যার ফলে এই ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো যাবে না। কিছু বিশ্লেষক পরামর্শ দিয়েছেন, এই যুদ্ধ ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো নিজেদের রক্ষা করতে আরও দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এছাড়া প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের সমর্থন বন্ধ করানোর যে লক্ষ্য ট্রাম্প নিয়েছিলেন, সেটিও অপূর্ণ রয়ে গেছে। ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি এখন আগের চেয়েও কট্টরপন্থী নতুন ইরানি নেতাদের মোকাবিলা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে যুদ্ধের পরও তাদের কাছে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবশিষ্ট থাকবে।
একই সাথে পরামর্শ ছাড়াই যুদ্ধে জড়ানোর কারণে প্রথাগত ইউরোপীয় মিত্রদের সাথেও সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা এবং তাদের অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়টি থেকে নতুন শিক্ষা নিচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবার্ট কাগান যুক্তি দিয়েছেন, এই ফলাফল ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও বড় বিপর্যয় হতে পারে কারণ ওই দেশগুলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে ছিল। আটলান্টিক ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, "আগের অবস্থায় ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই; এমন কোনো চূড়ান্ত আমেরিকান বিজয় আসবে না যা এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে।"
