নরওয়ের গণমাধ্যমকে এড়ালেন মোদী: যেভাবে প্রশ্নের মুখে ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
নরওয়েজিয়ান একজন সাংবাদিকের অপ্রত্যাশিত কিছু প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর মাধ্যমে ভারতের সরকারের অস্বস্তিকর ইস্যুগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সাথে সরাসরি কথা না বলার পুরনো প্রবণতাটি নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে।
সোমবার নরওয়ের প্রভাবশালী পত্রিকা দাগসভিসেনের সাংবাদিক হেলে লিং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি গণমাধ্যমের কাছ থেকে প্রশ্ন নেন না? মোদি এই প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়েই জায়গা ছেড়ে চলে যান।
এর কিছুক্ষণ পর ওই একই সাংবাদিক ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। ওই কর্মকর্তা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ভারতের ইতিহাস, শূন্য (০) আবিষ্কার, এবং দাবা খেলার গল্প জুড়ে দেন, যা নিয়ে পরবর্তীতে তিনি রীতিমতো রেগেও যান!
ঘটনার পেছনের গল্প মোদি উত্তর ইউরোপ সফরের অংশ হিসেবে দু'দিনের সফরে নরওয়ে গিয়েছিলেন। সোমবার নরওয়েজিয়ান প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরের সাথে সাক্ষাৎ করেন তিনি এবং পরের দিন তৃতীয় ইন্ডিয়া-নর্ডিক সামিটে যোগ দিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে বুধবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিয়োর্জিয়া মেলোনির সাথে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
ভারতের ক্ষমতায় দীর্ঘ ১২ বছর কাটানোর সময় মোদি দেশে একটিও আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন বা প্রেস কনফারেন্স করেননি। বিদেশ সফরেও তার সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেওয়ার ঘটনা খুব বিরল। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ওয়াশিংটনে দু'বার প্রশ্ন নেওয়ার কথা উল্লেখযোগ্য।
নরওয়েতে সাংবাদিককে এড়িয়ে যাওয়ার এই ঘটনা সংবাদমাধ্যমগুলোতে ভারতের সাংবাদিকতার স্বাধীনতার অবনতি নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের বর্তমান অবস্থান ১৫৭তম।
নরওয়েতে যা ঘটেছিল সোমবার এক্স-এ মোদি পোস্ট করেছিলেন যে তিনি নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি 'প্রেস মিট'-এ অংশ নিয়েছেন। তবে সেখানে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
সংবাদ সম্মেলনে লিং যখন জিজ্ঞাসা করেন, 'প্রধানমন্ত্রী মোদি, বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন গণমাধ্যম থেকে আপনি কেন প্রশ্ন নিতে চান না?', তখন মোদি কিছুই না বলে কেবল ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তিনি ওই সাংবাদিকের প্রশ্নটি আদৌ শুনেছেন কিনা, তা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লিং তখন মোদির পিছু নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'আমাদের সরকারের আপনার ওপর বিশ্বাস রাখা কি যৌক্তিক?' এই প্রশ্নেরও কোনো জবাব আসেনি। পরে ওই সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেন।
লিং পরে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমরা তো আগেই জানতাম তিনি উত্তর দেবেন না, কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী সবসময় এটাই করেন। কিন্তু আমাদের কাজ হলো চেষ্টা করা। ভারতে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের পরিস্থিতি যে অত্যন্ত খারাপ, সেটা আমি ভালো করেই জানি।'
নরওয়েজিয়ান প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোর শুরুতে কেবল নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিলেও, পরে তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
সোমবারের অন্য একটি সংবাদ সম্মেলনে স্বেন্ডসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি (পশ্চিম) সিবি জর্জকে ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, এমনকি ঘৃণামূলক মন্তব্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ধর্মান্তর এবং বিয়ে নিয়ে কঠোর সব আইন ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কিত কিছু নিয়ম দেশের অসাম্প্রদায়িক সংবিধানকে ধ্বংস করছে বলেও সমালোচকরা বলছেন।
জর্জ অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে বলেন, 'দাবা আবিষ্কার ভারতে হয়েছে। শূন্য (০)-র ধারণা ভারত থেকে এসেছে। কোভিড মহামারির সময় ভারত অনেক দেশকে কোটি কোটি টিকা ও ওষুধ দিয়েছে।' তিনি যোগ করেন, 'আমরা এমন একটি সভ্যতা নিয়ে গর্বিত। যোগব্যায়াম ভারতে উদ্ভূত।'
এ কথা শুনে লিং জর্জকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি সরাসরি মানবাধিকার নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না। এতে দৃশ্যতই রেগে যান জর্জ। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, 'ভারত একটি সুসভ্য দেশ। আমরা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ, তবে বিশ্বের সমস্যার এক-ষষ্ঠাংশ আমরা নই।'
মোদির বিরুদ্ধে এই সমালোচনার মূল কারণ কী?
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়ানোর জন্য মোদির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন নয়। দেশে ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকলেও তিনি কখনোই কোনো সাধারণ সংবাদ সম্মেলন করেননি।
বরং শুধুমাত্র সরকারি মতাদর্শের কাছাকাছি থাকা নির্দিষ্ট কিছু মিডিয়ার সাথেই কথা বলেন। অনেক সময় তার দপ্তরের নির্দেশে মিডিয়ার প্রশ্নগুলো আগে থেকে জমা নিয়ে তবেই শুধু লিখিতভাবে উত্তর দেওয়া হয়, যার কারণে পাল্টা প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকে না।
২০২৩ সালে হোয়াইট হাউসে একটি বিরল যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকার পত্রিকা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মুসলিম সাংবাদিক সাবরিনা সিদ্দিকি মোদিকে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে একটি প্রশ্ন করেছিলেন।
যদিও মোদি এর বেশ সাবলীল উত্তর দিয়েছিলেন, তবে প্রশ্নটি করার পর সিদ্দিকিকে অনলাইনে ভারতীয় উগ্রবাদীদের ভয়াবহ হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল। এমনকি নরওয়েতে সাংবাদিক হেলে লিিং-কেও এরপর থেকে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচুর আক্রমণাত্মক মন্তব্য শুনতে হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, মোদির ঠিক আগের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার বিদেশ সফরের সময় প্রায়শই ফ্লাইটের ভেতরে সংবাদ সম্মেলনে বসতেন এবং সাংবাদিকদের সব কঠিন ও তীর্যক প্রশ্নের মোকাবিলা করতেন।
এমনকি ১৯৮৩ সালের জুন মাসে নরওয়েতে গিয়ে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও অনায়াসেই সাংবাদিকদের সামনে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
সমালোচকদের বক্তব্য
ভারতের বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী মোদির সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, 'যার কিছু লুকানোর নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই।'
এদিকে, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস-এর কুনাল মজুমদার আল জাজিরাকে জানান, গত এক দশকে ভারতে সাংবাদিকরা মানবাধিকার বা রাজনৈতিক জবাবদিহিতার মতো কঠিন প্রশ্ন করার পরিবেশ সম্পূর্ণ হারিয়েছে। তার মতে, ভারতে সাংবাদিকরা ক্রমাগত আইনি ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, যেমন আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিপিজে আরও জানিয়েছে যে, গত কয়েক বছরে সরকারের আদেশে অসংখ্য খবরের সাইট, ওয়েবসাইট ও সংবাদমাধ্যমের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে। এমন চাপের কারণেই মূলত ভারতীয় সাংবাদিকতায় এখন এক ধরণের ভীতিকর সেলফ-সেন্সরশিপের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
