ইরান যুদ্ধ যেভাবে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে
পারস্য উপসাগরে মাথা উঁচু করে থাকা একটি দেশ কাতার। একসময় এই দেশের মানুষের আয়ের মূল উৎস ছিল সমুদ্রে মুক্তা খোঁজা। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাস এই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দেয়। মুক্তা খোঁজা সেই মানুষগুলোর দেশই হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র।
গত তিন দশক ধরে কাতার নিজেদের সরবরাহ লাইন তৈরি করেছে। প্রতি বছর শত শত কোটি ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের বন্দরে বন্দরে পাঠিয়েছে তারা।
গ্যাস ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানি থেকেই কাতারের মোট রাজস্বের ৬০ শতাংশের বেশি আয় হয়। এই বিপুল অর্থ দিয়েই এই স্থানটিকে একটি ঝলমলে মহানগরীতে পরিণত করেছে তারা। ধুলোমাখা মরুভূমির জায়গায় গড়ে উঠেছে আকাশচুম্বী সব করপোরেট ভবন।
গ্যাসের আয় দিয়ে রাজধানী দোহার সঙ্গে লুসাইল শহরের সংযোগকারী মেট্রো রেল তৈরি হয়েছে। লুসাইল শহরে প্যারিসের আদলে শপিং মল এবং কৃত্রিম বরফের থিম পার্কও বানানো হয়েছে। এই গ্যাসের টাকাই ব্যবহৃত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে। ৬০০ বিলিয়ন ডলারের একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (সভরেন ওয়েলথ ফান্ড) গঠন করেছে কাতার, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং—সবখানেই তাদের বিনিয়োগ রয়েছে।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে কাতারের এই ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে হঠাৎ করেই ছন্দপতন হয়।
থমকে গেছে অর্থনীতি
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের গ্যাস রপ্তানি বড় ধাক্কা খেয়েছে। সমুদ্রপথে যা কিছু আমদানি করত দেশটি, এখন তার সবই প্রায় বন্ধ। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ভয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে পর্যটন খাত, আর ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাসও তলানিতে এসে ঠেকেছে।
কাতারের গ্যাস উৎপাদনের মূল কেন্দ্র রাস লাফান এখন বন্ধ। এর চারপাশের রাস্তাঘাটও আটকে দেওয়া হয়েছে। দোহার দক্ষিণে হামাদ বন্দরের লোডিং ক্রেনগুলো এখন অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো রাজধানীজুড়ে হোটেল আর বিলাসবহুল দোকানগুলোতে এক অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে।
স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজরি ফার্ম 'এশিয়া গ্রুপ'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল সম্প্রতি দোহায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'কাতারের জন্য গ্যাস রপ্তানিই হলো অর্থনীতির মূল ভিত্তি। জ্বালানি সম্পদ না থাকলে আজ এখানে যা দেখছেন, তার কিছুই সম্ভব হতো না।'
তিনি আরও বলেন, 'এ জন্যই কাতার খুব দ্রুত একটি চরম আর্থিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।'
ইরান অবরোধ আরোপ করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি জানিয়ে দেয়, তারা চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। দুই সপ্তাহ পর ইরানি ড্রোন ও মিসাইল রাস লাফান কারখানায় আঘাত হানে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হয় এবং কাতারের উৎপাদন সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে যায়।
এর মানে হলো, আগামীকাল যদি হরমুজ প্রণালি খুলেও যায়, তবু যুদ্ধপূর্ববর্তী উৎপাদনে ফিরতে কাতারের কয়েক বছর লেগে যাবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কাতারএনার্জির ইতিমধ্যে কয়েক শ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। প্রণালি যত দিন বন্ধ থাকবে, আরও কয়েক কোটি ডলার লোকসান গুনতে হবে তাদের।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, এ বছর কাতারের অর্থনীতি ৮.৬ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং ২০২৭ সালে গিয়ে তা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ার জানান, কাতারের মতো দেশগুলোর জন্য প্রণালি বন্ধ থাকার প্রতিটি দিনই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তুলছে।
কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলো কাতার?
১৯৯০-এর দশকে কাতারের অর্থনৈতিক রূপান্তরের শুরু। তারা দেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত 'নর্থ ফিল্ড' থেকে গ্যাস উত্তোলন করে তাকে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরলে পরিণত (এলএনজি) করা শুরু করে। এর ফলে আঞ্চলিক পাইপলাইনের ওপর নির্ভর না করে জাহাজে করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে গ্যাস পাঠানোর সুযোগ পায় দেশটি।
এভাবেই জন্ম হয় এক জ্বালানি পরাশক্তির। ১৯৯৬ সালে জাপানে ৬০ হাজার টনের প্রথম চালান পাঠানোর মাধ্যমে শুরু হয় এই যাত্রা। ২০১০ সাল নাগাদ তাদের উৎপাদনক্ষমতা ৭৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। এর পরের এক দশকের বড় অংশ জুড়ে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে কাতার ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ।
স্থানীয়রা এই সময়টাকে পরিবর্তনের যুগ হিসেবে মনে রেখেছেন। দোহার উত্তরে মরুভূমির বুক চিরে গড়ে ওঠা রাস লাফান শিল্পনগরীতে ১০০ বর্গমাইলের বেশি এলাকাজুড়ে গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তরলীকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে।
রাজধানীর দক্ষিণে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে মাইলের পর মাইল শিল্পকারখানা দাঁড়িয়ে আছে। রাস লাফান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা গ্যাস থেকে সেখানে অ্যামোনিয়া ও সার তৈরি হয়।
১৯৯০ থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত গড়ে বছরে প্রায় ১৩ শতাংশ হারে কাতারের অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠেছে। এই বিপুল নির্মাণযজ্ঞের জন্য কাতার বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করেছে। বর্তমানে এর ৩২ লাখ অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই প্রবাসী।
এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ২০১৯ সালে কাতার ঘোষণা দেয় যে ২০২৭ সালের মধ্যে তারা নর্থ ফিল্ড থেকে বছরে ১২৬ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদন করবে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই সক্ষমতা ছিল ৭৭ মিলিয়ন টন। এই সম্প্রসারণ প্রকল্পটিকে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এসে এই পুরো কর্মযজ্ঞ থমকে যায়। প্রতিবেশী সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কাতারের কোনো পাইপলাইন নেই, যা দিয়ে তারা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে গ্যাস রপ্তানি করতে পারে। ভৌগোলিকভাবে কাতার এই জলপথের জন্য পুরোপুরি আটকা পড়ে আছে।
পর্যটন ও ব্যবসায় মন্দা
এই যুদ্ধ কাতারের আরেকটি বড় দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কাতার অনেক দিন ধরেই নিজেদের একটি পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।
২০১৯ সালে কাতার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্থানীয় অংশীদার রাখার বাধ্যবাধকতা বাতিল করে। এ ছাড়া ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিলাসবহুল হোটেলে থাকার খরচেও ভর্তুকি দেওয়া শুরু করে তারা। স্থানীয়রা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে এমন কোনো মাস যেত না, যেদিন কোনো বড় আন্তর্জাতিক স্পোর্টস ইভেন্ট কাতারে হয়নি।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করায় কাতারে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীর সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ভয়ে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কর্মীদের কাতার থেকে সরিয়ে নিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল গত মার্চে জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পর্যটন খাত থেকে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। কাতারের ভেতরেও এই হতাশা বেশ স্পষ্ট। শহরের ঐতিহ্যবাহী বাজার শুক ওয়াকিফের দোকানিরা জানান, পর্যটনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়েও এখন ক্রেতার দেখা মিলছে না।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, কাতারের মতো দেশগুলোর অর্থনীতি বহুমুখীকরণ মূলত বিদেশি মূলধন, বিদেশি শ্রমিক এবং সর্বোপরি 'স্থিতিশীলতার ধারণার' ওপর নির্ভর করে।
তিনি আরও লেখেন, কাতারের বিমানবন্দরে বিমান হামলার সাইরেন এবং রাস লাফানে মিসাইল হামলার ছবি বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়েছে। এই দৃশ্যগুলো কাতারের 'স্থিতিশীলতার ধারণার' সঙ্গে মোটেও যায় না এবং মানুষের এই ভয় কাটতে অনেক সময় লাগবে। তার মতে, 'এই যুদ্ধ কাতারের জ্বালানি খাত এবং জ্বালানি-পরবর্তী অর্থনৈতিক ভিত্তি—দুটোতেই একসঙ্গে আঘাত হেনেছে।'
সরকারের ভর্তুকি ও ভবিষ্যৎ সংকট
কাতারের সরকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটি তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে। সমুদ্রপথ বন্ধ থাকায় এখন তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আগে যেখানে ইউরোপ থেকে তাজা কৃষিপণ্য এবং আমেরিকা থেকে শস্য সমুদ্রপথে আসত, এখন সেগুলো অনেক বেশি খরচে বিমানে করে বা সৌদি আরব হয়ে ট্রাকে করে আনতে হচ্ছে।
সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া হওয়ার কথা। কিন্তু সুপারমার্কেটের কর্মীরা জানান, আমদানি করা পণ্যের (যেমন তাঞ্জানিয়া থেকে বিমানে আনা অ্যাভোকাডো) দাম মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে। মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় স্থিতিশীল রাখতে সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে বলেই দাম এখনো মানুষের নাগালে রয়েছে।
সাধারণ মানুষ বলছে, তারা এখনো নিজেদের নিরাপদই মনে করে। তবে রাস লাফানে হামলার স্মৃতি অনেকের মনেই ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। দোহায় অনেকেই জানিয়েছেন, হামলার রাতে দিগন্তে বিশাল আগুনের কুণ্ডলী উঠতে দেখেছিলেন তারা। ওই আগুন এত ভয়াবহ ছিল যে রাজধানী থেকেও তা দেখা যাচ্ছিল এবং বাতাসে পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসছিল।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি এলএনজি থেকে আয় কয়েক বছরের জন্য বন্ধও হয়ে যায়, তবু কাতারের বিশাল জমানো সম্পদ দিয়ে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এবং জরুরি পরিষেবা চালু রাখতে পারবে।
একই সঙ্গে বিদেশি মূলধন ও মেধা যাতে দেশ ছেড়ে না যায়, সে জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে কাজ চালিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছে কাতারি কর্তৃপক্ষ। এশিয়া গ্রুপের আহমেদ হেলাল বলেন, 'ভয় হলো, যদি কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী দ্রুতই কাতার ছেড়ে চলে যেতে পারেন।'
হেলাল বলেন, 'যদি মানুষ দেশ ছাড়া শুরু করে, তবে পরিস্থিতি বেশ ভয়ংকর হয়ে উঠবে।' তিনি জানান, কাতার কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত 'বেশ ভালোভাবেই শান্ত পরিস্থিতি বজায় রেখেছে এবং ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিচ্ছে।' তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, 'একটি বিশাল অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সবকিছু নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি কত দিন বন্ধ থাকে, তার ওপর।'
