ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় মজুদে ঘাটতি: প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত উৎপাদনের তাগিদ দিচ্ছে পেন্টাগন
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে চরম ঘাটতি দেখা দেওয়া সমরাস্ত্রসহ অন্যান্য অস্ত্রের উৎপাদন ও সরবরাহ ত্বরান্বিত করতে মার্কিন সামরিক শিল্পখাতের প্রতি তাগিদ দিয়েছে পেন্টাগন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি গোপন স্মারকের (মেমো) বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর নিশ্চিত করেছে।
ওই মেমো অনুযায়ী, মার্কিন উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ গত বুধবার সামরিক শিল্পখাতের শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে একটি নির্দেশনামূলক চিঠি পাঠান। এতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামাদির ক্ষেত্রে "উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত ও সরবরাহের আগ্রাসী সময়সূচি নির্ধারণ এবং/অথবা উৎপাদন বাড়াতে" কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ২১ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন।
মেমোতে ফেইনবার্গ স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, "বছরের পর বছর ধরে চলা উন্নয়ন চক্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের এখনই অস্ত্র কর্মসূচিগুলোর সময়সূচি নাটকীয়ভাবে দ্রুত করতে হবে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।"
এই বিষয়ে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের এই ঘাটতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের মধ্যে টানাাপোড়েন তৈরি হওয়ার পরই এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কংগ্রেসে অচলাবস্থা কাটিয়ে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত–- এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হওয়া কঠিন। তবে এই সংকট মোকাবিলায় পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের গৃহীত একাধিক পদক্ষেপের মধ্যে এটি সবচেয়ে সাম্প্রতিক।
অবশ্য বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে "বিপুল পরিমাণ" সমরাস্ত্র রয়েছে। তিনি লেখেন, "প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ তৈরি করা হচ্ছে।"
সামরিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা শিল্পখাতকে কাজে লাগানোর জন্য হোয়াইট হাউসের চেষ্টার পরই ফেইনবার্গের এই বার্তা সামনে এলো।
সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন ব্যক্তি জানান, জুলাইয়ের শেষদিকে প্রথাগত প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও সিলিকন ভ্যালির আধুনিক অস্ত্র প্রস্তুতকারী স্টার্টআপগুলোকে হোয়াইট হাউসে ডাকা হয়। সেখানে ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের পরিচালক রাসেল ভট এবং হোয়াইট হাউসের লেজিসলেটিভ অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক পরিচালক জেমস ব্রেইডের সঙ্গে তারা বৈঠকে বসেন।
উক্ত সূত্রে জানা যায়, লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান, বোয়িং,অ্যান্ডুরিল এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানি পালানটিরের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কোম্পানির নির্বাহীদের পরামর্শ দেওয়া হয়– তারা যেন সরাসরি আইনপ্রণেতাদের কাছে লবিং চালান, যাতে 'কনগ্রেশনাল রিকনসিলিয়েশন' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো যায়। ফক্স নিউজ আগেই এই বৈঠকের কথা জানিয়েছিল।
কম খরচের গোলাবারুদ থেকে শুরু করে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ বাড়াতে পেন্টাগন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক শীর্ষ মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও উদীয়মান স্টার্টআপের সঙ্গে বেশ কয়েকটি "কাঠামোগত চুক্তি" করার ঘোষণা দিয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিগুলো হলো– মার্কিন সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের মধ্যে আইনি কিন্তু অ-বাধ্যতামূলক চুক্তি। এসব চুক্তি অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায় ঠিকই, তবে চুক্তিগুলো চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত করতে কংগ্রেসের অর্থায়নের প্রয়োজন হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, "এগুলো এক ধরনের চুক্তি করার সন্মতি মাত্র, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। প্রকৃতপক্ষে প্রায় কিছুই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ করা হয়নি, আর সমস্যাটা এখানেই।"
এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেছেন, " (সমরাস্ত্র) উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে শিল্প নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা নতুন কিছু নয়। শুরু থেকেই এটি প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল।"
তিনি আরও জানান, "ফেইনবার্গের ওই মেমোটি বাস্তব একটি নথি এবং এটি কংগ্রেসে তহবিলের জন্য জমা দেওয়া ২০২৮ অর্থবছরের বাজেট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনে চলমান প্রচেষ্টার সঙ্গে এটি পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।"
ফুরিয়ে আসা সমরাস্ত্র
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের আগের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কেবল প্রথম মাসেই আমেরিকা ৮৫০টিরও বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং ১,০০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করেছে। এ ছাড়া যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলোতে মার্কিন সেনাবাহিনী ১,৩০০টিরও বেশি ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে।
সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সপ্তাহ পর্যন্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদ যুদ্ধপূর্ব ২,২০০টি থেকে কমে ৮২৭টির নিচে নেমে এসেছে এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ৪৫২টি থেকে কমে ২৭৮টির নিচে পৌঁছেছে।
অস্ত্র সরবরাহ বাড়াতে গত কয়েক মাসে পেন্টাগন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত সোমবার পেন্টাগন প্যাট্রিয়ট এডভান্সড ক্যাপাবিলিটি-৩ (প্যাক-৩) ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে নর্থরপ গ্রুম্যান ও লকহিড মার্টিনের সঙ্গে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি ঘোষণা করে। এছাড়া গত সপ্তাহে লকহিড মার্টিনকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্যাক-৩-এর উৎপাদন তিন গুণ বাড়াতে ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যের একটি চুক্তি প্রদান করে পেন্টাগন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলা চালানোর সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে এবং তাদের জন্য কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে পেন্টাগন গত মাসে অ্যান্ডুরিল, ক্যাস্টেলিয়ন, কো-অ্যাসপায়ার, লিডোস এবং জোন ৫-এর মতো ডিফেন্স টেক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একাধিক কাঠামোগত চুক্তি ঘোষণা করে। এছাড়া জুন মাসের শেষের দিকে প্রতিরক্ষা বিভাগ সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন স্টার্টআপের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন সমরাস্ত্র পুনর্গঠনে এসব কোম্পানিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ওয়ার কলেজে এক বক্তৃতা প্রদানকালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ মার্কিন শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পেন্টাগনের সমরাস্ত্র ক্রয়প্রক্রিয়া আমূল বদলে ফেলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যাতে যুদ্ধের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উৎপাদন করা যায়।
হেগসেথ বলেন, "আমাদের সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক যুদ্ধসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য মার্কিন শিল্পখাত ও তাদের উদ্ভাবনী চেতনা উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নিয়মকানুনের জালে আটকে তাদের স্বাভাবিক গতিকে শ্লথ না করে আমাদের উচিত প্রকৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।"
