বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি: নীতিমালা করতে বিপিসিকে ৪ দিন সময়, তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিক্রির সুযোগ দিতে চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) এ খসড়া তৈরি করতে বলা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এ নির্দেশনার সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, এত বড় ধরনের সংস্কারের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বড় পরিসরে আলোচনা, কারিগরি সমীক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে এর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার জারি করা এক চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ১০ আগস্টের মধ্যে 'বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬'-এর খসড়া জমা দিতে নির্দেশ দেয়।
এ নির্দেশ এমন সময়ে এলো, যখন বিপিসিতে পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান নেই। গত ২৬ জুলাই রেজানুর রহমানকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে।
শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় খসড়া তৈরির জন্য বিপিসি কার্যত মাত্র দুই কর্মদিবস সময় পাচ্ছে। এদিকে আগামী ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত মাতারবাড়ী জ্বালানি হাব সফরের প্রস্তুতি নিয়েও ব্যস্ত রয়েছেন সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আসিফ আহমেদের সই করা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত নীতিমালাটি করা হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের প্রবেশের বিপক্ষে সুপারিশ
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি দেওয়ার আবেদন পর্যালোচনায় বিপিসির ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা এসেছে ওই কমিটির পর্যালোচনার পর।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানান, কমিটি গত ২১ জুলাই মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে এ খাত বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত না করার সুপারিশ করা হয়।
এর পাঁচ দিন পর বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে পদ থেকে সরিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।
কমিটির সুপারিশ এবং চেয়ারম্যানকে সরানোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
তবে বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, স্থায়ী নেতৃত্ব না থাকায় মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা করপোরেশনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বিপিসির পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক টিবিএসকে বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কথা শুনেছেন, তবে এখনো চিঠিটি হাতে পাননি।
তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে বিপিসিতে তিনজন পরিচালক রয়েছেন। নীতিমালার খসড়া তৈরির দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।"
সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এর আগে নিয়ন্ত্রক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চার দিনের মধ্যে বাস্তবসম্মতভাবে এমন একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তামিম বলেন, "অনেক বিষয়ই সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।" সরকারি ও বেসরকারি উভয়পক্ষকে এ খাতে কার্যক্রমের সুযোগ দেওয়া হলে মূল্য নির্ধারণ, প্রতিযোগিতা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি ভর্তুকিও বড় একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ দেশে জ্বালানির দাম এখনো পুরোপুরি বাজারভিত্তিক নয়।
তামিম বলেন, "ভর্তুকি চালু থাকলে বেসরকারি অপারেটররাও তা পাবে কি না এবং পেলে কোন ব্যবস্থায় পাবে, সরকারকে সেটি নির্ধারণ করতে হবে।" এ ধরনের ব্যবস্থা ভারতে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো জ্বালানি আমদানিতে অংশ নিতে পারলেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিপণন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময় লাগবে।
তামিম বলেন, "আমদানি এক বিষয়, আর বিপণন আরেক। বর্তমান বিতরণব্যবস্থা বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। বেসরকারি অপারেটরদের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়।"
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আগে ভোক্তা সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা প্রয়োজন।
তার মতে, কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো কার্যকর রাষ্ট্রীয় তদারকির আওতায় থাকা উচিত।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জার-ই-খোরশেদ আলম চার দিনের সময়সীমাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, "সরকার অনেক সময় স্বল্প সময়সীমা নির্ধারণ করে, পরে তা বাড়ানো হয়। মাত্র চার দিনে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব।"
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে চলমান অস্থিরতার মধ্যে এ খাত বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করা কতটা বিচক্ষণ হবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন।
তার মতে, বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা উচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর বেশি নির্ভরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এ খাত উন্মুক্ত করার আগে স্বচ্ছ নীতিমালা, স্পষ্ট জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় থাকে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে।
