শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে চীনে ট্রাম্প
প্রায় এক দশক পর প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীনে গেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সফরে তার সঙ্গে আছেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এবং ইলন মাস্কের মতো শীর্ষ ব্যবসায়িক ব্যক্তিরা।
আজ বুধবার (মে ১৩) বেইজিং পৌঁছালে ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে স্বাগত জানানো হয়। দুই দিনের এই সফরের প্রথম দিনেই তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে আমেরিকান ব্যবসার জন্য চীনের বাজার আরও 'উন্মুক্ত' করার আহ্বান জানাবেন বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো কিছু অর্থনৈতিক ফায়দা অর্জন করা এবং ভঙ্গুর বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ধরে রেখে ইরান যুদ্ধের কারণে ক্ষুণ্ন হওয়া তার জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনা।
বুধবার বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামার সময় চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সামরিক 'অনার গার্ড' এবং দুই দেশের পতাকা হাতে শিক্ষার্থীরা ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানায়। ম্যান্ডারিন ভাষায় 'স্বাগত, উষ্ণ অভ্যর্থনা' স্লোগান শুনে রেড কার্পেটে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সবার দিকে হাত নাড়েন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সিইওরা মূলত সেই কোম্পানিগুলো থেকেই এসেছেন, যারা চীনে ব্যবসায়িক বাধা দূর করার চেষ্টা করছে। যেমন, এনভিডিয়া তাদের শক্তিশালী 'এইচ২০০' এআই চিপ চীনে বিক্রির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একটি সূত্রের তথ্যমতে, একেবারে শেষ মুহূর্তে হুয়াংকে সফরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প এবং আলাস্কায় রিফুয়েলিংয়ের সময় হুয়াংকে বিমানে উঠতে দেখা যায়।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, 'আমি প্রেসিডেন্ট শি-এর কাছে চীনকে আরও 'উন্মুক্ত' করার অনুরোধ জানাব, যাতে এই মেধাবী মানুষগুলো তাদের চমৎকার কাজ করতে পারে।'
এ ব্যাপারে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বেইজিং সব সময়ই সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অশান্ত বিশ্বে স্থিতিশীলতা দিতে প্রস্তুত।
এদিকে ট্রাম্প যখন জমকালো আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছিলেন, তার ট্রেড নেগোশিয়েটর স্কট বেসেন্ট দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা কর্মকর্তাদের সাথে তিন ঘণ্টার প্রস্তুতিমূলক বৈঠক শেষ করেন। চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এই আলোচনাকে 'গঠনমূলক' বললেও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।
ট্রাম্পের দুই দিনের সফরে গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ সংবর্ধনা, ঐতিহাসিক টেম্পল অফ হেভেন পরিদর্শন এবং একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বাণিজ্যের বাইরে ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মহলেই ধারণা, ইরান যুদ্ধ থামাতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প চীনের কাছে সাহায্য চাইবেন। তবে চীন তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তীব্র আপত্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে, যেখানে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ এখনও ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বেসেন্টের প্রস্তুতি বৈঠক
এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প যখন সিইও-দের সাথে আলোচনায় ছিলেন, স্কট বেসেন্ট তখন দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিয়ন বিমানবন্দরে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হি লাইফেংয়ের সাথে প্রায় তিন ঘণ্টার একটি বৈঠক করেন।
উভয় পক্ষই গত অক্টোবরের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে আগ্রহী। ট্রাম্প সে সময় শুল্ক স্থগিত করেছিলেন এবং বিনিময়ে শি জিনপিং বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অস্ত্রে ব্যবহৃত 'রেয়ার আর্থ' খনিজ সরবরাহ বন্ধের অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন।
আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বোয়িং বিমান ও জ্বালানি বিক্রির মতো বিষয় উঠে আসবে। অন্যদিকে, চীন চাইছে তাদের ওপর থেকে সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির সরঞ্জামের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কমানো হোক।
তবে ট্রাম্প এই আলোচনায় তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে আছেন। কারণ আদালত তাকে চীনের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক বসানোর ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিপরীতে, চীনের অর্থনীতি কিছুটা মন্দার মুখে থাকলেও শি জিনপিং এমন কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে নেই। উইসাওয়া অ্যাডভাইজরি-এর সিইও লিউ কিয়ান বলেন, 'ট্রাম্পের জন্য এই বৈঠক চীনের চেয়ে বেশি জরুরি। কারণ তাকে ভোটারদের বোঝাতে হবে যে তিনি চুক্তি সই করতে পারছেন এবং দেশের অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে।'
ট্রাম্প শি-এর সাথে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক এবং চীনের প্রতি সম্মানের কথা বারবার বললেও, অনেক বেইজিংবাসীর সন্দেহ কাটেনি। লউ হেইলিয়ান নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, 'তিনি সত্যিই আন্তরিক কিনা তা আমি জানি না। তবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি আশা করি, এর থেকে ভালো কোনো নীতি বেরিয়ে আসবে।'
