পেট্রোডলার: আমেরিকার বিশ্বজয়ের হাতিয়ার নাকি কেবলই ভ্রান্ত ধারণা?
অর্থনীতিবিদরা খুব সহজেই অন্যকে জ্ঞান বা পরামর্শ দিতে ভালোবাসেন। তবে মুশকিল হলো, তারা নিজেরা সব সময় সেই পরামর্শ মেনে চলেন না।
ইব্রাহিম ওয়েইস নামের এক তরুণ অর্থনীতিবিদ ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। মিসরের শিল্প মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় তিনি নিজের বসদের মুখের ওপর কিছু রূঢ় সত্যি কথা বলে বসেন।
তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেছিলেন, সব শিল্প-কারখানা শুধু রাজধানী কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়ায় গাদাগাদি করে বানালে তা একসময় দেশের জন্য বিপদের কারণ হবে।
শুধু তা-ই নয়, সে সময়ের প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের একটি কথারও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন ওয়েইস। প্রেসিডেন্ট সেসময় গর্ব করে বলেছিলেন যে, মিসর 'সুই থেকে শুরু করে একেবারে ক্ষেপণাস্ত্র'—সবকিছুই নিজেরা তৈরি করে (যদিও বাস্তবে এটি একেবারেই সত্য ছিল না)।
এতটা সত্যি কথা মুখের ওপর বলে দেওয়ায় তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই চরম বিপাকে পড়ে যান। আর এর পরিণতি হিসেবে, ১৯৬০ সালে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালান তিনি; এরপর তার জন্য নিজের দেশে ফেরা আর কোনোদিনই সহজ হয়নি।
গল্পের দৃশ্যপট পাল্টায় ১৯৭৪ সালে। ইব্রাহিম ওয়েইস তখন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। সে সময় তিনি বিশ্ব অর্থনীতির এক নতুন বিপদের দিকে নজর দেন। উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো তখন তেল বেচে এত দ্রুত ও এত বেশি ডলার জমা করছিল যে, তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছিল না এত টাকা দিয়ে তারা কী করবে!
সেই বছরের মার্চ মাসে এক ভাষণে তিনি একটি নতুন শব্দ যোগ করেন—আর তা হলো 'পেট্রোডলার'।
পেট্রোডলার আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায় বললে, তেল বিক্রি করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার আয় করে, অর্থনীতির ভাষায় তাকেই 'পেট্রোডলার' বলা হয়। ওয়েইসের এই এক শব্দের ঘোষণার মাধ্যমেই তার নাম ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের মতো খোদাই হয়ে যায়।
পেট্রোডলারকে শুরুতে আমেরিকা ও অন্যান্য তেল আমদানিকারক দেশের জন্য বড় এক শঙ্কার কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তীতে এই পেট্রোডলারই আমেরিকার নিজস্ব মুদ্রার (ডলার) সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের বৈশ্বিক আর্থিক মহাশক্তির মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এর নেপথ্যে ছিল ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে আমেরিকার অর্থ দপ্তর বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের নেওয়া এক গোপন সিদ্ধান্ত। ইসরায়েলের সমর্থককে অর্থায়ন করার সমালোচনা থেকে বাঁচতে, আমেরিকা সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত নিলামের বাইরে গোপনে আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড বা ঋণপত্র কেনার সুযোগ দেয়।
ঠিক সেই সময়েই সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি 'আরামকো' এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ঘোষণা করে যে, অপরিশোধিত তেল বিক্রির ক্ষেত্রে এখন থেকে তারা আর ব্রিটিশ পাউন্ড নেবে না, সারা বিশ্বকে তাদের কাছ থেকে তেল কিনতে হলে শুধু ডলারেই দাম মেটাতে হবে!
তেল কেনার জন্য ডলার বাধ্যতামূলক করে দেওয়ায় রাতারাতি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার মুদ্রার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। তেল বেচে আরব দেশগুলোর পাওয়া সেই টাকার পাহাড় পুনরায় বন্ডের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতিতেই যুক্ত হতে থাকে।
এর ফলে আমেরিকার অর্থনীতি এক জাদুকরী জায়গায় পৌঁছে যায় এবং তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে খবরদারি করার অসীম ক্ষমতা পায়। গত বছর 'এনোডো ইকোনমিকস'-এর গবেষক ডায়ানা চোয়লেভা জানান, 'গত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এই পেট্রোডলার ব্যবস্থাই আমেরিকার আর্থিক দাপট বজায় রাখার মূল ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে আসছে।'
পেট্রোইউয়ান যুগের শুরু ও ডলারের সংকট
কিন্তু, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ এই পেট্রোডলার ব্যবস্থার শক্ত ভিত্তির ওপর একটি বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন আর পশ্চিমা দেশগুলো নয়; তাদের প্রধান বাজার এখন এশিয়া।
চীন দীর্ঘ দিন ধরেই ইরান থেকে কেনা তেলের দাম ডলারে না দিয়ে নিজেদের মুদ্রা 'ইউয়ান'-এ পরিশোধ করে আসছে। এমনকি ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার করেও পণ্য কেনাবেচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে তারা। এদিকে রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোও তেলের দাম নিজেদের মুদ্রায় মেটানোর সুযোগ খুঁজছে।
এসব বড় বড় পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করেই গত মার্চে ডয়েচে ব্যাংকের বিশ্লেষক মল্লিকা সচদেবা দাবি করেন, 'ইরান সংঘাত হয়তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে পেট্রোডলারের দিন ফুরিয়ে আসছে, আর বিশ্ববাজারে 'পেট্রোইউয়ান' যুগের সূচনা হতে চলেছে।'
কিন্তু এই দাবি কতটা সত্যি? ডায়ানা চোয়লেভা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তার মতে, অনেক দেশ এবং কোম্পানি তেলের দাম ডলারের বদলে অন্য মুদ্রায় মেটানোর একটা সুযোগ হাতে রাখতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিজেদের বেশিরভাগ বৈশ্বিক লেনদেনের জন্যই তারা এখনো ডলারের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল।
চীনের বিশাল তেল আমদানির কারণে হয়তো বিশ্ববাজারে তাদের মুদ্রার প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়বে। তবে তাই বলে আগামী পাঁচ বছরে বৈশ্বিক তেলের লেনদেনে ইউয়ানের পরিমাণ ১০ শতাংশও পার হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা নিতান্তই অমূলক।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, পেট্রোডলার ব্যবস্থার আধিপত্য কমলে কি সত্যিই আমেরিকার ভয়ের কারণ আছে? সচদেবা মনে করেন, তেলের দাম ডলারে মেটানোর ব্যবস্থাটি মূলত আমেরিকার মুদ্রার রাজত্ব ধরে রাখার একটি 'প্রধান ভিত্তি'।
বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো যেহেতু ডলারের মাধ্যমে তেল বা জ্বালানি কেনে, তাই নিজেদের পণ্য অন্য দেশের কাছে বিক্রির ক্ষেত্রেও তারা ডলার ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
এর কারণ হলো, মুদ্রার দরের ওঠানামার ধাক্কা থেকে বাঁচার এটি একটি প্রাকৃতিক উপায় (ন্যাচারাল হেজ)। সহজ করে বললে, কোম্পানি তেল কিনতে যে ডলার ব্যয় করে, নিজের পণ্য বেচে পাওয়া ডলার দিয়ে তারা সহজেই তার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
তবে এই যুক্তির একটি বড় দুর্বলতা হলো—এটি ধরে নেয় যে অন্যান্য পণ্যের মতো তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করে না! কিন্তু বাস্তবতা একেবারে উল্টো।
শেয়ার বাজারে তেলের দাম প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত পাল্টায়। অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, ডলারের মান কমলে তেলের দাম বেড়ে যায়। এই অবস্থায় কোম্পানিগুলো যদি ডলার কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, তাহলে ওই ভারসাম্য রাখার কৌশল কোনো কাজেই আসে না।
কোম্পানিগুলো যদি সত্যিই নিজেদের উৎপাদন খরচের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে চায়, তবে তারা তেলের দিকে না তাকিয়ে বরং ভারী যন্ত্রপাতি বা স্পেয়ার পার্টসের দামের দিকেই বেশি নজর দেয়—যাদের দাম চট করে বাড়ে-কমে না।
অন্যদিকে, শুধু তেলের কারণেই যে বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার এতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ কথা পুরোপুরি সঠিক নয়। ১৯৭০-এর দশকে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলের বিপুল টাকা আমেরিকার ট্রেজারিতে এসে জমা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এই লাভের পাহাড় আজীবন স্থায়ী হয়নি।
'কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস'-এর বিশ্লেষক ব্র্যাড সেটসার একটি পরিষ্কার পরিসংখ্যান দিয়েছেন। তিনি দেখান, ১৯৭০ সাল থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব তেল বেচে যে বিপুল পরিমাণ লাভ করেছিল, পরের বছরগুলোতে তাদের ঘাটতির কারণেই তা সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাদের লাভ আবার ঘাটতির মুখে পড়ে।
সেটসারের হিসাব মতে, গত বছর (২০২৫ সালে) বিশ্বের সব তেল রপ্তানিকারক দেশ মিলে মোট অতিরিক্ত লাভ বা সারপ্লাস করেছিল মাত্র ২০০ বিলিয়ন ডলার। এর ঠিক বিপরীতে, একই বছর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর শিল্প-কারখানাগুলো ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল সারপ্লাস ঘরে তুলেছিল! অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতি শুধু তেলের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
নতুন এক 'জিম্মি' সংকট
১৯৭৪ সালে ওয়েইস যে 'পেট্রোডলার' ধারণা দিয়েছিলেন, আজকের যুগে ডলারের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তা আর প্রধান কোনো হাতিয়ার নয়। আর তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোও একাই বিশ্বের অর্থ ব্যবস্থার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলবে—এমনটা হওয়ার সুযোগও এখন নেই।
তবে এটা চরম সত্য যে, চলমান ইরান যুদ্ধ ডলারের শক্তি টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোনো কাজেই আসছে না। আমেরিকা যেভাবে কথায় কথায় বিভিন্ন দেশের ওপর চরম আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছে, তা বিশ্বের অনেক দেশকেই গভীর চিন্তায় ফেলেছে। ফলে দেশগুলো এখন বাধ্য হয়েই ডলারের বিকল্প এবং নিজেদের সম্পদ নিরাপদে রাখার অন্য রাস্তা খুঁজছে।
সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ঠিক ৫০ বছর আগে তার ওই ঐতিহাসিক বক্তৃতায় ওয়েইস এমন এক আশঙ্কার কথাই জানিয়েছিলেন! তিনি বলেছিলেন, আমেরিকা সবসময় 'মুক্তবাজার' বা ফ্রি মার্কেটের বুলি আওড়ালেও, অনেক দেশের মনেই একটি গুপ্ত ভয় রয়েছে।
তাদের ধারণা, আমেরিকা হয়তো ক্ষমতার জোর খাটিয়ে চাইলেই যেকোনো দেশের সম্পদ জব্দ করে দিতে বা দখল নিতে পারে। তিনি এই বিদেশি সম্পদগুলোকে নাম দিয়েছিলেন 'জিম্মি মূলধন' বা 'হোস্টেজ ক্যাপিটাল'।
আর সামনের দিনগুলোতে আমেরিকার প্রতাপশালী ডলারের ভাগ্য ঠিক কী হতে চলেছে—তা এই পুরোনো 'পেট্রোডলার' নয়, বরং দেশগুলোর এই 'জিম্মি হওয়ার ভয়' এবং বিশ্ব রাজনীতিই সবচেয়ে ভালোভাবে নির্ধারণ করে দেবে।
