ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়ায়—টানা দ্বিতীয় মাসের মতো যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম। এর ফলে দেশটিতে গত তিন বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে ০.৯ শতাংশ বৃদ্ধির পর এপ্রিল মাসে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়েছে আরও ০.৬ শতাংশ।
বার্ষিক ভিত্তিতে এপ্রিলে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩.৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন। এর আগে মার্চে এই হার ছিল ৩.৩ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির এই উল্লম্ফনের মূল কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়া। বিশেষ করে, দেশটিতে পেট্রল বা গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ৫.৪ শতাংশ। বার্ষিক ভিত্তিতে জ্বালানির দাম বাড়ার চিত্রটি আরও ভয়াবহ। গত ১২ মাসে সামগ্রিকভাবে জ্বালানির দাম ১৭.৯ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে পেট্রলের দাম বেড়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮.৪ শতাংশ বেশি।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন (৩.৭৮ লিটার) পেট্রলের গড় দাম ৪.৫০ ডলার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথমবারের মতো ইরানে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরু করে, তখন এই দাম ছিল মাত্র ২.৯৮ ডলার।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়ারোস আল জাজিরাকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, "জ্বালানি খরচ বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে। জেট ফুয়েলের ক্রমবর্ধমান দাম সামাল দিতে এয়ারলাইনগুলো ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।"
আগের মাসের তুলনায়, এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে বিমানে ভ্রমণের ব্যয় বেড়েছে ২.৮ শতাংশ। জেট ফুয়েলের এই অস্বাভাবিক দাম এয়ারলাইনগুলোর ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। এমনকি টানা ৩৪ বছর ব্যবসায় থাকার পর চলতি মাসের শুরুর দিকে 'স্পিরিট এয়ারলাইনস' তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। আদালতে দেওয়া নথিতে এয়ারলাইনটি তাদের এই পরিস্থিতির জন্য 'সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে' দায়ী করেছে।
'আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না'
এদিকে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমেরিকানরা বর্তমানে যে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—তা ইরানের সাথে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে কি না। জবাবে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "মোটেও না।"
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "ইরানের বিষয়ে আমি যখন কথা বলি, তখন একটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি কারো বিষয়েই ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয়ই ভাবি: আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিতে পারি না।"
হোয়াইট হাউস আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই মূল্যবৃদ্ধি সম্ভবত সাময়িক হবে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, "অপারেশন এপিক ফিউরি'র ফলে সৃষ্ট সাময়িক অস্থিরতার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিলেন।"
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইরানের সাথে চলমান সংঘাত পণ্যের দাম আরও অনেক দিন চড়াই রাখবে। বার্নার্ড ইয়ারোস বলেন, "আমরা ধারণা করছি এই প্রান্তিকেই সিপিআই মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। তবে কোর সিপিআই (স্থায়ী পণ্য ও সেবা) এ বছর উচ্চ থাকলেও এখান থেকে খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা কম।"
মুদিপণ্যের বাজারেও আগুন
মার্কিন বাজারে মুদিপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী, যা এপ্রিল মাসে বেড়েছে ০.৭ শতাংশ। আগের মাসের তুলনায় মাংস, মুরগি, মাছ ও ডিমের দাম বেড়েছে ২.৭ শতাংশ। বিশেষ করে গরুর মাংসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে ২.৭ শতাংশ।
ফলমূল ও শাকসবজির দাম বেড়েছে ১.৮ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় টমেটোর মতো পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ; এমনকি গত এক মাসেই বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। এছাড়া কফির দাম গত বছরের তুলনায় ১৮.৫ শতাংশ এবং আগের মাসের তুলনায় ২ শতাংশ বেড়েছে।
বাইডেন প্রশাসনের হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের সাবেক সদস্য অ্যালেক্স জ্যাকুয়েজ আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, "যুদ্ধ যতদিন চলবে, দাম ততই বাড়বে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও কয়েক মাস পর্যন্ত তা উচ্চমূল্যেই বজায় থাকবে।"
তবে গত বছরের তুলনায় ডিমের দাম ৩৯ শতাংশ কমেছে, যা নিয়ে হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রচারণা চালিয়েছে। যদিও মাসিক ভিত্তিতে ডিমের দাম ১.৫ শতাংশ বেড়েছে। হোয়াইট হাউস স্মার্টফোনের দাম গত বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কমার বিষয়টিও সামনে এনেছে, যদিও গত এক মাসে দাম বেড়েছে ১ শতাংশ। উল্লেখ্য, গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন, স্মার্টফোন সেই তালিকা থেকে মুক্ত ছিল।
শুল্কের আওতাভুক্ত অন্য খাতগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। পোশাকের দাম ০.৬ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দামও বেড়েছে। বেডরুমের আসবাবপত্র এবং খেলনার দাম বেড়েছে ০.৮ শতাংশ।
কমেছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ও পুঁজিবাজারের সূচক
অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় কিছুটা কমেছে। সামগ্রিকভাবে ওষুধের দাম গত মাসের তুলনায় ০.৪ শতাংশ এবং গত বছরের তুলনায় ০.৫ শতাংশ কমেছে। কুশ দেশাই বলেন, "এপ্রিলের সিপিআই রিপোর্ট প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্টের বিশেষ উদ্যোগ ও স্বচ্ছতা কার্যক্রমের ফলে ওষুধ ও হাসপাতালের সেবার ব্যয় কমছে।"
এদিকে মূল্যস্ফীতির এই রিপোর্টের পরপরই মার্কিন পুঁজিবাজারের কেন্দ্র ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধরণের পতন লক্ষ্য করা গেছে। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুর পর্যন্ত প্রযুক্তিখাত-নির্ভর কোম্পানিগুলোর সূচক নাসডাক ১.৪ শতাংশ, ডাউ জোনস ০.৬ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক ০.৮ শতাংশ কমে।
চলতি সপ্তাহেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ'-এর প্রধান হিসেবে জেরোম পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন কেভিন ওয়ার্শ। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও শ্রমবাজার স্থিতিশীল থাকায় ফেড এ বছর সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যদিও ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল পিয়ার্স জানান, "শক্তিশালী অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে সময় নেবে। আমরা এখন জুনের পরিবর্তে ডিসেম্বরে সুদের হার কমানোর আশা করছি।"
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা— সিএমই ফেডওয়াচের মতে, ফেডারেল রিজার্ভের আগামী বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ।
