ভেনেজুয়েলায় হামলার পূর্বমুহূর্তের মতোই এবার কিউবার আকাশে স্পাই বিমানের বিচরণ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
গত তিন মাসে কিউবার আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর বা নজরদারি বিমানের (স্পাই প্লেন) বিচরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নতুন এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানের আগেও ঠিক একইভাবে দেশটির আকাশে মার্কিন স্পাই প্লেনের আনাগোনা বেড়েছিল।
উন্মুক্ত বিমান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কিউবার উপকূল বরাবর মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর অন্তত ২৫টি বিমান এবং ড্রোন ট্র্যাক করা গেছে।
এই প্যাটার্নটি ভেনেজুয়েলার কথা মনে করিয়ে দেয়। গত ৩ জানুয়ারি ভোরে মার্কিন বিশেষ বাহিনী দেশটির রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে। পরে মাদক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়।
কী ধরনের বিমান উড়ছে কিউবায়?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউবার আকাশে মূলত পি-৮এ পসেইডন মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া আরসি-১৩৫ভি রিভেট জয়েন্ট এবং এমকিউ-৪সি ট্রাইটন হাই-অলটিটিউড রিকনেসান্স (উচ্চ-উচ্চতার নজরদারি) ড্রোনও দেখা গেছে।
এই ফ্লাইটগুলো মূলত কিউবার রাজধানী হাভানা এবং সান্তিয়াগো ডি কিউবার কাছাকাছি এলাকায় দেখা গেছে। কিছু বিমান স্থলভাগের ৪০ মাইলের মধ্যে চলে এসেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট হুমকি।
সিএনএনের একজন বিশ্লেষক বলেন, 'উপকূলের একেবারে কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়া এই বিমানগুলো কেবল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সহজ সুযোগের জন্যই নজর কাড়ছে না, বরং এগুলোর আকস্মিক আবির্ভাব এবং সময়কালও প্রশ্ন তুলছে। গত ফেব্রুয়ারির আগে এই এলাকায় দৃশ্যত এমন বিমান উড্ডয়নের ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিরল।'
ট্রাম্পের হুংকার ও কিউবার বিদ্যুৎ-বিপর্যয়
মাদুরোকে সফলভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন যে কিউবা এখন তার হাতের মুঠোয়। ১৯ জানুয়ারি ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি ফক্স নিউজের একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করেন। সেখানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক থিসেন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষের আগেই ট্রাম্প একটি 'স্বাধীন হাভানা' সফর করবেন।
এরপর ট্রাম্প কিউবার ওপর জ্বালানি তেলের অবরোধ আরোপ করেন, যা দেশটির জ্বালানি সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কিউবা প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য মাদুরোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাদুরোর পতনের পর সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবা এমনিতেই সংকটে ছিল, আর ট্রাম্পের অবরোধ সেই সংকটকে আরও তীব্র করে।
তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে কিউবার বিদ্যুৎব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ধসে পড়েছে। দেশটিতে এখন তীব্র ব্ল্যাকআউট চলছে। এর ফলে হাসপাতালগুলো সাধারণ চিকিৎসাসেবা দিতে পারছে না, স্কুল বন্ধ রয়েছে এবং বিমানের ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে।
১৬ মার্চ ফক্স নিউজ কিউবা নিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, 'আমি এটিকে স্বাধীন করি বা দখল করি... সত্যি বলতে, আমি মনে করি আমি এটা নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারি। তারা এখন খুবই দুর্বল একটি দেশ।'
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবাকে 'অযোগ্য কমিউনিস্টদের' দ্বারা পরিচালিত একটি 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' বলে কটাক্ষ করেন।
ফ্লোরিডার সাবেক সিনেটর রুবিও বেড়ে উঠেছেন মিয়ামির কমিউনিস্ট-বিরোধী কিউবান প্রবাসী সমাজে। তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈরী দক্ষিণ আমেরিকান বামপন্থী সরকারগুলোর কড়া সমালোচনা করে ।
তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলা ও কিউবায় সরকার পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে আসছেন। মাদুরোকে আটকের অভিযানের প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ পুরো লাতিন আমেরিকার জন্য একটি সতর্কবার্তা। তিনি বলেছিলেন, 'এই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কেউ খেলতে আসবেন না, কারণ এর ফল ভালো হবে না।'
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সেন্ট কিটস ও নেভিসে এক কূটনৈতিক সম্মেলনে রুবিও কিউবা সম্পর্কে বলেন, 'কিউবার বর্তমান অবস্থা অগ্রহণযোগ্য। কিউবার পরিবর্তন দরকার। এর পরিবর্তন হতেই হবে।'
ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইরান সংঘাতের সমাধান হলে তিনি 'প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই' কিউবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তার প্রশাসন কিউবার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈরী দেশগুলোর সঙ্গে হাত মেলানো, এমনকি তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে সহায়তা করার কারণেই কিউবা সরকারের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এর জবাবে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে 'ঘৃণ্য কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক এবং হাস্যকর' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
