ট্রাম্পের চাপ সত্ত্বেও তেল উৎপাদন বাড়াবে না এক্সন ও শেভরন
যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট সামলাতে গিয়ে হোয়াইট হাউস রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সংকট কাটাতে মার্কিন প্রশাসন বারবার তেল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসলেও তা কানে তুলছে না এক্সনমোবিল ও শেভরন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এই দুই তেল কোম্পানি জানিয়ে দিয়েছে, প্রশাসনের চাপে পড়ে তারা উৎপাদন বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না।
এক্সন-এর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) নীল হ্যানসেন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-কে (এফটি) জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল পারমিয়ান বেসিনে কোম্পানির পুরনো কৌশলেই তারা অটল রয়েছেন, এতে 'কোনো পরিবর্তন' আনা হয়নি।
শেভরনের ফাইন্যান্স প্রধান ইমার বোনারও একইভাবে সাফ জানিয়ে দেন, 'এই বর্তমান সংকটের কারণে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাতেই পরিবর্তন আনিনি।'
ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে তেল পরিশোধনের কাজেও।
এর ফলে বিশ্ববাজারে এক ভয়ংকর জ্বালানি সংকটের জন্ম নিয়েছে, যা সব দেশেই মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোলের দামও প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
অথচ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশবাসীকে কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি তেলের দাম ২ ডলারের নিচে নামিয়ে আনবেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তার সেই প্রতিশ্রুতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সরকার বাধ্য হয়ে তাদের 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' বা জরুরি অবস্থার জন্য জমানো তেলের মজুত থেকে বাজারে তেল সরবরাহ শুরু করেছে। পাশাপাশি তেল কোম্পানিগুলোকেও উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই দুটি কোম্পানি যুদ্ধের আগে নিজেদের জন্য যে ব্যবসায়িক নীতি ঠিক করেছিল, তাতেই অনড় রয়েছে।
এ বিষয়ে নীল হ্যানসেন বলেন, 'নতুন করে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন আমরা দেখছি না, কারণ আমরা আগে থেকেই পুরোদমে এবং সর্বোচ্চ গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'অবশ্য তার মানে এই নয় যে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর কথা একেবারেই ভাবছি না। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।'
শেভরনের ইমার বোনার আরও পরিষ্কার করে বলেন, 'আমরা চাইলেই পারমিয়ান বেসিনে উৎপাদন বাড়াতে পারি, কিন্তু সেটা আমাদের কৌশলগত লক্ষ্য নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নগদ অর্থের প্রবাহ বা "ফ্রি ক্যাশ ফ্লো" বাড়ানো, কেবল তেলের উৎপাদন বাড়ানো নয়।'
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, 'মাত্র আট সপ্তাহের এক আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বড় কোনো পরিবর্তন আনব—এমনটা আশা করা উচিত নয়।'
শুক্রবার এই দুটি কোম্পানি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি থেকে মার্চ) ব্যবসায়িক হিসাব প্রকাশের সময় এসব কথা বলে।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে এক্সনের নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি (৪.২ বিলিয়ন) ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কম। এই বড় পতনের প্রধান কারণ ছিল প্রায় ৩৯০ কোটি (৩.৯ বিলিয়ন) ডলারের এক ধরনের লোকসান।
মূলত যেসব তেলের জাহাজ বা কার্গো এখনও ডেলিভারি দেওয়া হয়নি, সেগুলোর বিমাজনিত হিসাব মেলাতে গিয়ে খাতাপত্রে এই লোকসান দেখানো হয়েছে। তবে কোম্পানিটি আশা করছে, আগামী কয়েক মাসে চুক্তির পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া হলে এই লোকসানের খাতা নিজে থেকেই মিলে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে এক্সন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারণ গত বছর তাদের মোট উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশই এসেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে।
এপ্রিলে কোম্পানিটি আগেই সতর্ক করে বলেছিল যে, যুদ্ধের কারণে প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের অন্তত ৬ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।
এক্সনের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস এক বিবৃতিতে বলেন, 'প্রথম প্রান্তিকের হিসাব আমাদের প্রমাণ করেছে যে, এক্সনমোবিল এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মৌলিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। সব ধরনের প্রতিকূলতা এবং বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও তারা সমান তালে কাজ করে যেতে পারে।'
এক্সন আরও ঘোষণা দিয়েছে যে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তারা শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারপ্রতি ১.০৩ ডলার করে লভ্যাংশ বা মুনাফা দেবে।
অন্যদিকে শেভরন এই সংকটে এক্সনের চেয়ে কিছুটা কম ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে তাদের নিট আয় ছিল ২২০ কোটি (২.২ বিলিয়ন) ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ কম। তবে তারা জানায়, তাদেরও খাতাপত্রে প্রায় ২৯০ কোটি (২.৯ বিলিয়ন) ডলারের এমন অবাস্তবায়িত লোকসান বা 'পেপার লস' রয়েছে।
তবে উৎপাদনের দিক থেকে শেভরন কিছুটা উন্নতি করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় তাদের উৎপাদন প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত বেড়েছে। মার্কিন তেল কোম্পানি হেস-কে অধিগ্রহণ, 'গালফ অব আমেরিকা'য় উৎপাদন বাড়ানো এবং পারমিয়ান বেসিনে কাজ সম্প্রসারণের কারণেই তাদের উৎপাদন এই হারে বেড়েছে।
বাজার খোলার আগের প্রি-মার্কেট ট্রেডিংয়ে শেভরনের শেয়ারের দাম ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। সব মিলিয়ে এ বছর তাদের প্রবৃদ্ধি এখন পর্যন্ত ২৭ শতাংশে দাঁড়াল। এক্সনের শেয়ারের দামও ০.৪ শতাংশ বেড়েছে।
এই দুটি সুপারমেজর তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এক্সন এবং শেভরন দুজনেই জানিয়েছে যে, বিশ্ববাজারে ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যের আকাশছোঁয়া দামের সর্বোচ্চ ফায়দা তুলতে তারা বর্তমানে তাদের রিফাইনারিগুলো বা তেল শোধনাগারগুলোকে নিজেদের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালাচ্ছেন।
