যেভাবে ইসরায়েলি সৈন্যদের ওপর প্রাণঘাতী ড্রোন চালানোর কৌশল রপ্ত করেছে হিজবুল্লাহ
দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ি এলাকায় একটি ইসরায়েলি ট্যাংকের পাশে জড়ো হয়েছিলেন একদল সেনা। ঠিক তাদের মাথার ওপর তখন ঘুরছিল ছোট একটি ড্রোন। মুহূর্তের মধ্যেই ড্রোনটি ক্ষিপ্র গতিতে নিচে নেমে সেনাদলের ওপর বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন।
বিশৃঙ্খল ঐ পরিস্থিতি থেকে আহতদের উদ্ধার করতে যখন একটি সামরিক হেলিকপ্টার অবতরণ করছিল, তখনো হিজবুল্লাহর হামলা শেষ হয়নি। ওপর থেকে দ্বিতীয় আরেকটি ড্রোন পুরো দৃশ্যটি ভিডিও করছিল। সেটিও লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসে এবং হেলিকপ্টারটির মাত্র কয়েক গজ দূরে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।
পুরো ঘটনাটি ভিডিও করছিলেন এক ইসরায়েলি সেনা। তাকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, "ওয়াও, ওয়াও! আরও একটি ড্রোন! অবিশ্বাস্য!"
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এখন ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে 'ফার্স্ট-পারসন-ভিউ' (এফপিভি) ড্রোন ব্যবহার করছে। সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাদের মতে, এটি ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য এক নতুন ও বড় ধরনের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তারা গাজা বা লেবাননের আগের যুদ্ধগুলোতে মোকাবিলা করেনি। সস্তা ও আকারে ছোট এই ড্রোনগুলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। সম্প্রতি ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন সেনাদের ওপরও এগুলো ব্যবহার করেছে। শত ডলার মূল্যের এই ড্রোনগুলো রাডারে ধরা পড়া কঠিন এবং এগুলোর আঘাত অত্যন্ত নিখুঁত।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা অনেক বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে মঙ্গলবার এক বাবা ও ছেলে ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য খননকাজ (এক্সক্যাভেটর চালানো) করার সময় ড্রোনের আঘাতে প্রাণ হারান।
প্রস্তুতিহীন ইসরায়েল ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সামনে থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় অপ্রস্তুত থাকায় খোদ ইসরায়েলের ভেতরেই সরকার ও সামরিক বাহিনীর ওপর সমালোচনা বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এখনো চলছে। এই পরিস্থিতিতে ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলায় মরিয়া হয়ে কৌশল খুঁজছে তেল আবিব।
গত মঙ্গলবার এক ভিডিও বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, 'ড্রোন হামলার হুমকি নির্মূল করতে কয়েক সপ্তাহ আগে আমি একটি বিশেষ প্রকল্পের নির্দেশ দিয়েছি। এতে সময় লাগলেও আমরা এই হুমকি নস্যাৎ করে দেব।'
এদিকে হিজবুল্লাহ সম্প্রতি ডজনখানেক ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে তাদের এফপিভি ড্রোনগুলো ইসরায়েলি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং খননযন্ত্রে আঘাত হানছে। ড্রোন বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভিডিওগুলো প্রমাণ করে হিজবুল্লাহর ড্রোন অপারেটররা অত্যন্ত দক্ষ এবং তারা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
ইউক্রেনের সতর্কতা অবজ্ঞা
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেক্সি রেজনিকভ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরানের ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় তারা বারবার ইসরায়েলকে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসরায়েল তা পাত্তা দেয়নি। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা রেজনিকভ বলেন, 'দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সতর্কবাণী আমলে নেওয়া হয়নি। ৭ অক্টোবর থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েল রাশিয়ার যুদ্ধকৌশল এবং ইরানের প্রক্সি শক্তির সমন্বয়ে তৈরি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে।'
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ড্রোন হুমকি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এটি মোকাবিলায় নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে।
এফপিভি ড্রোনের ভয়াবহতা
সাধারণত একজন পাইলট বিশেষ চশমা (গগলস) পরে এই ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন, যা তাকে ড্রোনের ক্যামেরার দৃশ্য সরাসরি দেখতে সাহায্য করে। ২০২২ সালে ইউক্রেনীয় সেনারা প্রথম বাজারে সাধারণ ড্রোনের সঙ্গে বিস্ফোরক বেঁধে রুশ বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের অধিকাংশ হতাহতের কারণ এই এফপিভি ড্রোন। এর পাল্লা সাধারণত ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়, তবে সিগন্যাল রিপিটার বা ফাইবার অপটিক কেবল ব্যবহার করলে এটি আরও দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক সিএনএ-এর উপদেষ্টা স্যামুয়েল বেন্ডেট বলেন, 'ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পর এই প্রযুক্তির বিস্তার দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা জানি ইরান ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে।'
হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালের জুন মাস থেকেই এফপিভি ড্রোনের পরীক্ষা শুরু করেছিল। তবে পেজার বিস্ফোরণ এবং লেবাননে ইসরায়েলি স্থল অভিযানের পর কিছুদিন এটি বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি তারা আবার পুরোদমে ফিরে এসেছে।
সবচেয়ে বড় আতঙ্ক: ফাইবার অপটিক কেবল
ইসরায়েলের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক ড্রোন। এগুলো জ্যামিং বা কোনো ইলেকট্রনিক উপায়ে থামানো অসম্ভব, কারণ এগুলো তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে রাশিয়া প্রথম এই প্রযুক্তির সার্থক ব্যবহার করে।
ইউক্রেনের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান 'ইনফোজাহিস্ট'-এর প্রধান নির্বাহী ইয়ারোস্লাভ কালিনিন বলেন, 'ফাইবার অপটিক ড্রোন মোকাবিলা করা সবচেয়ে কঠিন। এটি ঠেকানোর মতো কার্যকর কোনো পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।'
মাঠপর্যায়ে সেনাদের আতঙ্ক
লেবাননে কর্মরত ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনারা জানিয়েছেন, ড্রোন থেকে বাঁচতে তারা এখন বিভিন্ন সরঞ্জাম ও চৌকি জাল (নেট) দিয়ে ঢেকে রাখছেন। এটি মূলত ইউক্রেনীয় সেনাদের ব্যবহৃত একটি কৌশল।
এক ইসরায়েলি সেনা জানান, দিনে অন্তত ১০ বার ড্রোন হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। ড্রোন আসার সংকেত পেলেই তাদের ঘরের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিতে বলা হয়। তিনি বলেন, 'যতদিন পর্যন্ত ড্রোন হামলায় প্রাণহানি ঘটেনি, ততদিন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।'
সামরিক বিশ্লেষক ইগ্যাল লেভিনের মতে, হিজবুল্লাহর ড্রোন অপারেটররা দিন দিন অভিজ্ঞ হয়ে উঠছে। এমনকি একটি ড্রোনের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াও তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবানন যুদ্ধের ভিডিওগুলো দেখলে মনে হয় তারা তাদের নিজের যুদ্ধের অতীতের কোনো দৃশ্য দেখছেন। কলিনিনের ভাষায়, 'এফপিভি ড্রোনই এখন নতুন বাস্তবতা। এটি উৎপাদন করা যেমন সহজ, ব্যবহার করাও তেমন সহজ। এটি তো কেবল শুরু। দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্ব আর আগের মতো নিরাপদ থাকবে না।'
