মাদক সম্রাটদের স্ত্রীদের গোপন জীবন: লাতিন আমেরিকার নার্কো-সাম্রাজ্যের পেছনের নারীরা
ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ কার্টেলগুলোর চরম পুরুষতান্ত্রিক জগতেও মাঝেমধ্যে এমন কিছু নারী থাকেন, যাদের ওপর কড়া নজর রাখা প্রয়োজন। চলতি বছরের শুরুতে মেক্সিকোর সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম ওয়ান্টেড মাদক পাচারকারী নেমেসিও 'এল মেনচো' ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেসকে ধরার জন্য ঠিক এই পথটিই বেছে নিয়েছিল।
হালিস্কো রাজ্যে স্পেশাল ফোর্সের সেই দুঃসাহসিক অভিযানে এল মেনচো ধরা পড়েন। মেক্সিকো ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ যাকে বছরের পর বছর খুঁজছিল এবং যার মাথার দাম ছিল ১৫ মিলিয়ন ডলার, তাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে স্রেফ তার এক প্রেমিকার সূত্র ধরে। ওই নারী অজান্তেই কর্মকর্তাদের পশ্চিম মেক্সিকোর টাপালপা পাহাড়ের একটি কেবিনের দিকে নিয়ে যান, যেখানে আত্মগোপন করে ছিলেন এই কুখ্যাত অপরাধী।
কর্তৃপক্ষ ওই রহস্যময়ী নারীর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখলেও, ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ কার্টেলগুলোর ভেতরের সারিতে নারীদের ভূমিকার বিষয়টি এই অভিযানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই জগতটি তথাকথিত 'মাচিজমো' বা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও, সেখানে নারীরা ট্রফি ওয়াইফ থেকে শুরু করে পাচারকারী এবং অপরাধ জগতের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সব পর্যায়েই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটম্যান বা মাঠপর্যায়ের সশস্ত্র সদস্যরা সাধারণত পুরুষ হলেও, কার্টেল পরিচালনার লজিস্টিক এবং আর্থিক দিকগুলো সামলানোর জন্য নারীরাই সবচেয়ে বেশি যোগ্য। বিশেষ করে যদি তারা কার্টেল প্রধানদের স্ত্রী হন, তবে তারা খুব কাছ থেকে ব্যবসার ভেতরের সব খবর জানার সুযোগ পান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সংগঠিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ হেনরি জিমার বলেন, "আপনি যদি কোনো শীর্ষ কার্টেল নেতার স্ত্রী হন, তবে আপনি সম্ভবত তাদের লজিস্টিক, অপারেশন এবং কৌশল সম্পর্কে সবকিছুই জানেন। ফলে যখন আপনার স্বামী গ্রেপ্তার হন বা নিহত হন, তখন আপনার পক্ষে ব্যবসার বড় একটি অংশ দখল করে নেওয়া সম্ভব হয়।"
ল্যাটিন আমেরিকার অপরাধ জগতের অন্যতম আলোচিত নারী প্রধান ছিলেন কলম্বিয়ার গ্রিজেল্ডা ব্লাঙ্কো, যিনি 'কোকেন কুইন' নামে পরিচিত। সত্তরের এবং আশির দশকের মায়ামির ড্রাগ যুদ্ধে তার উত্থানের সময় তিনি পর পর তিনজন স্বামীকে গ্রহণ করেছিলেন এবং তারা প্রত্যেকেই তার অপরাধ জগতের অংশীদার ছিলেন।
কর্তৃপক্ষের মতে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় ব্লাঙ্কো কলম্বিয়া থেকে মায়ামিতে টনকে টন কোকেন পাঠাতেন। কুখ্যাত মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবার এবং মেডেলিন কার্টেলের সঙ্গে যুক্ত এই নারী কয়েক ডজন হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন। মায়ামি-ডেড তদন্তকারীদের মতে, তিনি তার পুরুষ সমকক্ষদের মতোই সমান সহিংস ছিলেন। 'পিস্তোলেরো' নামে পরিচিত একটি বন্দুকধারী বাহিনী পরিচালনা করতেন তিনি এবং ড্রাইভ-বাই শুটিং বা চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি ছুড়ে মানুষ হত্যায় তার কুখ্যাতি ছিল। এমনকি তার নির্দেশে চালানো একটি হামলায় এক শিশুরও মৃত্যু হয়েছিল।
লাস ভেগাসের দ্য মব মিউজিয়ামের শিক্ষা পরিচালক ক্লেয়ার হোয়াইট সিএনএনকে বলেন, "সত্তর ও আশির দশকে আমেরিকার কার্টেলগুলোর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত নির্দয়।"
তবে শুধু সহিংসতা নয়, ব্লাঙ্কোর আসল ক্ষমতা ছিল কার্টেল সাম্রাজ্যের লজিস্টিক এবং আর্থিক দিকগুলো সংগঠিত করা। কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির মালিক এই নারী অর্থ পাচারেও দক্ষ ছিলেন। পাচারের জন্য লুকানো পকেটসহ অন্তর্বাস তৈরির কারখানা এবং রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যও ছিল তার। নারী হওয়ার সুবিধায় তিনি সহজে নারী পাচারকারীদের নিয়োগ দিতে পারতেন।
১৯৮৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিয়া এজেন্ট বব পালোম্বর মতে, যখন তার দল ঘরে ঢুকেছিল, ব্লাঙ্কো তখন বিছানায় বাইবেল পড়ছিলেন। মাদক পাচার ও হত্যাকাণ্ডের দায়ে দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৪ সালে তিনি মুক্তি পান এবং কলম্বিয়ায় ফিরে যান। সেখানে ২০১২ সালে একটি কসাইখানার বাইরে তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
ব্লাঙ্কোর ছোট ছেলে মাইকেল কর্লিওন ব্লাঙ্কো—যার নামকরণ করা হয়েছিল 'দ্য গডফাদার' চলচ্চিত্রের চরিত্রের নামে—২০২৫ সালে দ্য মব মিউজিয়ামকে জানান, তার মা কখনোই পেছনে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। তিনি শৈশবে দেখেছিলেন কীভাবে তার মাকে অবজ্ঞা করায় তার বাবাকে (ব্লাঙ্কোর তৃতীয় স্বামী ডারিও সেপুলভেদা) গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। মাইকেল বলেন, "যদিও আমার বাবা পুরুষদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন, কিন্তু আমার মা-ই ছিলেন আসল বস এবং তিনি বাবাকে চিৎকার করে আদেশ দিতেন কী করতে হবে।"
চিলির কুখ্যাত লস মারচেন্ট ক্ল্যান-এর প্রধান আন্তোনেল্লা মারচেন্টও তার বাবার পাশাপাশি ব্যবসা চালাতেন। চিলির প্রসিকিউটর ইয়ানস এসকোবার সিএনএনকে জানান, আন্তোনেল্লা আর্থিক এবং লজিস্টিক দিকগুলো দেখাশোনা করতেন। তাদের কার্টেল বলিভিয়া থেকে কোকেন এনে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে সরবরাহ করত।
২০২১ সালের একটি অভিযানে ৩০০ কেজি কোকেন উদ্ধারের ঘটনায় ২০২৩ সালে আন্তোনেল্লা ও তার পিতাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন চিলির আদালত। যদিও তার বাবা দাবি করেছিলেন যে তিনি নিজেই মূল হোতা এবং তার পরিবারকে জড়াতে চাননি, কিন্তু আদালত তা গ্রহণ করেননি। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, "এটি স্পষ্ট যে এই গ্যাংয়ের নেতৃত্ব মূলত আন্তোনেল্লা মারচেন্টের হাতেই ছিল।"
এল মেনচোর স্ত্রী রোজালিন্ডা গঞ্জালেজ ভ্যালেন্সিয়া, যিনি 'লা জেফা' বা 'দ্য বস' নামে পরিচিত, তাকে বিশেষজ্ঞরা 'মাদক পাচারকারী রাজবংশীয়' নারী হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাই আবিগেল এবং তাদের পারিবারিক কার্টেল 'লস কুইনিস'-এর ওপর ২০১৫ সালে মার্কিন অর্থ দপ্তর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, এল মেনচোর উত্থানের পেছনে তার নিজের চেয়ে স্ত্রী রোজালিন্ডার অবদানই বেশি ছিল। মেক্সিকোর জননিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডেভিড সসেডো বলেন, "বাস্তবে এল মেনচো কার্টেল নেতৃত্বে পৌঁছেছেন বিবাহের মাধ্যমে একটি কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে।"
কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল ধরে রোজালিন্ডাকে কার্টেলের অন্যতম আর্থিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করে আসছিল। ২০১৮ সালে একবার গ্রেপ্তার হলেও প্রমাণের অভাবে তিনি ছাড়া পান। এরপর ২০২১ সালে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ এটিকে 'হালিস্কো রাজ্যের সংগঠিত অপরাধের আর্থিক কাঠামোর ওপর একটি উল্লেখযোগ্য আঘাত' হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০২৩ সালে অর্থ পাচারের দায়ে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও ২০২৫ সালে 'ভালো ব্যবহারের' জন্য তিনি মুক্তি পান।
তবে সব মাদক সম্রাটের স্ত্রীরা ব্যবসার গভীরে প্রবেশ করেন না। কার্টেল স্ত্রীদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা হলো 'বুচোনা'। মেক্সিকোর সিনালোয়া অঞ্চলে প্রচলিত এই শব্দটি দিয়ে মাদক সম্রাটদের রোমান্টিক সঙ্গিনীদের বোঝানো হয়, যাদের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে 'প্লাস্টিক সার্জারি, হীরাখচিত নখ এবং ইনস্টাগ্রাম'।
এরকম একজন আলোচিত 'বুচোনা' হলেন কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড জোয়াকিন 'এল চাপো' গুজম্যানের স্ত্রী এমা করনেল আইসপুরো। ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নেওয়া এই সাবেক বিউটি কুইন ১৭ বছর বয়সে এল চাপোর সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরে বিয়ে করেন। এল চাপো বর্তমানে মার্কিন কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।
এমা করনেল এখন একজন মডেল এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচিত। ইনস্টাগ্রামে তার ৫ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। যদিও তিনি স্বামীর ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন, তবে ২০২১ সালে মাদক পাচার ও অর্থ পাচারের দায়ে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তবে গবেষক ডেবোরা বোনেলোর মতে, এমা করনেলের মতো নারীরা স্রেফ বাহ্যিক গ্ল্যামার নিয়ে থাকলেও, অনেক নারীই পুরোপুরি ব্যবসায়ীর মতো কাজ করেন এবং তারা নিজেদের 'বুচোনা' বলতে নারাজ।
ঐতিহাসিক ইলেইন কেরি বলেন, সিনালোয়ার একজন 'নার্কা' (নারী মাদক ব্যবসায়ী) তাকে একবার বলেছিলেন, "আমি স্তন বড় করার জন্য কোনো সার্জারি করাব না, কারণ একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটকে আমার স্তনের মাপে কাস্টমাইজ করতে অনেক বেশি খরচ হবে।"
