যুক্তরাষ্ট্রে শিথিল হচ্ছে গাঁজা নীতি, ৪৭ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে বড় পরিবর্তনের আভাস
যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজা সম্পর্কিত নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির বিচার বিভাগ জানিয়েছে, গাঁজা ব্যবহার করে উৎপাদিত কয়েকটি পণ্যের ওপর থেকে অবিলম্বে বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে এবং খুব দ্রুতই এ মাদককে কম বিপজ্জনক হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস করা হবে।
কয়েক দশকের মধ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নীতিতে অন্যতম বড় পরিবর্তন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গাঁজা বৈধ হয়ে যাবে না। তবে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের এ শিল্পে বড় প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারণ ফেডারেল পর্যায়ে নানা বাধার মুখে থাকলেও, দেশটির প্রায় সব অঙ্গরাজ্যে কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য গাঁজাকে বৈধ করা হয়েছে এবং দেশটির প্রায় অর্ধেক অঙ্গরাজ্যে বিনোদনমূলক কাজে গাঁজা ব্যবহার বৈধ।
রাজ্য নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসায় গাঁজা থেকে উৎপাদিত পণ্যগুলোকে অত্যন্ত আসক্তিকর মাদকের (যেমন- হেরোইন) শ্রেণি থেকে সরিয়ে এমন একটি শ্রেণিতে নেওয়া হবে, যেখানে অপব্যবহারের ঝুঁকি কম বা মাঝারি। এই শ্রেণিতে সাধারণ ব্যথানাশক, কেটামিন ও টেস্টোস্টেরনের মতো ওষুধও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদিত গাঁজা থেকে উৎপাদিত পণ্যগুলোকেও একই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, সরকার শিগগিরই আরও বৃহৎ উদ্যোগ এগিয়ে নেবে, যার মাধ্যমে গাঁজার সব ধরনের ব্যবহারকে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করা হবে।
এই পদক্ষেপের ফলে গবেষণার ক্ষেত্রে বাধা কমবে, করের চাপ হ্রাস পাবে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থায়ন পাওয়া সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে ব্ল্যাঞ্চ বলেন, 'এই পুনর্বিন্যাসের ফলে গাঁজার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা সম্ভব হবে। এতে রোগীরা আরও ভালো চিকিৎসা পাবেন এবং চিকিৎসকেরা আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন।'
এর আগে গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিচার বিভাগকে গাঁজার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার নির্দেশ দেন।
এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্যানাবিস শিল্পে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে ক্যানোপি গ্রোথ, টিলরে ব্র্যান্ডস এবং ট্রুলিভ ক্যানাবিসের মতো কোম্পানিগুলো উপকৃত হতে পারে।
চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাঁজা ও ভোগ্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি এসব কোম্পানি ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসারের উপসর্গ, উদ্বেগসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণাও করছে।
শেয়ার দরের উত্থান, পরে পতন
এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত ক্যানাবিস কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর ৬ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে ফেডারেল সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের সীমিত পরিসর বিবেচনায় বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ায় পরে ফের শেয়ার দর কমে যায়।
টিলরে ব্র্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরউইন সাইমন বলেন, 'আজ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফেডারেল নীতি অবশেষে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রোগীদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে।'
গাঁজাকে 'স্কেডিউল-১' মাদক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল, যার অর্থ এটি অত্যন্ত অপব্যবহারযোগ্য এবং এর কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা ব্যবহার নেই। তবে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এর ব্যবহার বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ শ্রেণিবিন্যাসকে পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক বলে সমালোচনা করা হয়ে আসছে।
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২৪টি অঙ্গরাজ্য ও কলাম্বিয়া জেলায় বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য গাঁজা বৈধ। ৪০টি অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসার জন্য এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং আরও ৮টি অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসায় সীমিত পরিসরে ব্যবহার অনুমোদিত। কেবল আইদাহো ও কানসাস এই দুই অঙ্গরাজ্যে গাঁজার কোনো বৈধ ব্যবহার নেই।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিডিএসএ'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈধ বিক্রি ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশের পর সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস কিছু মেডিকেয়ার সুবিধাভোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শে হেম্পজাত পণ্য, যার মধ্যে ক্যানাবিডিওল (সিবিডি) রয়েছে, ব্যবহারের অনুমতি দিতে শুরু করে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, আরও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি কংগ্রেসকে আইন হালনাগাদ করার আহ্বান জানান, যাতে 'ফুল-স্পেকট্রাম' সিবিডি পণ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিক্রি সীমিত থাকে।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অবৈধ মাদক
গাঁজা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অবৈধ মাদক।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন মার্কিন নাগরিকের একজন বছরে অন্তত একবার এটি সেবন করেন।
গাঁজা রাখার অপরাধে লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। একই সময়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যবসাগুলো ক্যানাবিস-সম্পর্কিত পণ্য বিক্রি করছে।
২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসন এ ধরনের উদ্যোগ নিলেও, তা চূড়ান্ত হয়নি। পরে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ওই উদ্যোগ বাতিল করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মাদকের শ্রেণিবিন্যাস পুনর্নির্ধারণে প্রমাণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহে তারা ২৯ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করবে।
তবে গাঁজা বৈধ করার বিরোধীরা বলছেন, এতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাদক ব্যবহার বাড়তে পারে, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমতে পারে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প বিচার বিভাগকে নিয়ম শিথিলের নির্দেশ দিলে কংগ্রেসের কয়েক ডজন রিপাবলিকান আপত্তি জানান।
বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও আরকানসাসের রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে আমেরিকানদের জন্য একটি বিপজ্জনক মাদক ব্যবহার সহজ করবে।
এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি বলেন, 'আজকের গাঁজা ১০ বা ২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, যা মানসিক বিকার, অসামাজিক আচরণ এবং প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। গাঁজার মাদক শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন করা একটি ভুল পদক্ষেপ।'
