ইরানের সস্তা ও সাধারণ প্রযুক্তির ড্রোনের কাছে যেভাবে নাস্তানাবুদ যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সাথে চলা বর্তমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। সামরিক দিক দিয়ে ইরান নিজেদের কতটা শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, তা দেখে রীতিমতো বিস্মিত ওয়াশিংটন। এই যুদ্ধে কেবল আক্রমণের সাহসই দেখায়নি তেহরান; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এমন এক সস্তা ড্রোনের ব্যবহার শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের চরম বিপাকে ফেলে দিয়েছে।
ইরানের এসব ড্রোন বাণিজ্যিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বানানো হয়। ফলে একটি ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ৩৫ হাজার ডলার। অথচ, এই সস্তা খেলনার মতো ড্রোনগুলো ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে হচ্ছে অত্যাধুনিক সব সামরিক ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক, যেগুলোর একেকটির দাম শুনলে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!
এই সস্তা ড্রোনগুলোই ইউক্রেন যুদ্ধের পুরো চিত্র বদলে দিয়েছিল। আর এখন ইরানিরা এগুলো ব্যবহার করে আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ফাঁকফোকরটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বাইডেন প্রশাসনের সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল সি. হরোউইটজ জানান, কয়েক বছর ধরেই ড্রোন মোকাবিলা করা পেন্টাগনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। তবে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, 'এর একটি বড় ও কার্যকর সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত তাগিদ কখনোই ছিল না।'
ইরানের সাথে যুদ্ধের প্রথম ৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র খরচ করে ফেলেছিল প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার। এরপর আর আনুষ্ঠানিক হিসাব না পাওয়া গেলেও 'আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট'-এর আনুমানিক হিসাব বলছে, এপ্রিলে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে। আর এই বিপুল ব্যয়ের সিংহভাগই গেছে ড্রোনের পেছনে ছোড়া ইন্টারসেপ্টরের দাম মেটাতে গিয়ে। অনেক বিশেষজ্ঞ এখন এই ভেবে শঙ্কিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টরের মজুত এখন বিপজ্জনকভাবে ফুরিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ইরানের ড্রোনগুলো মোকাবিলা করতে যেসব উপায় ব্যবহার করছে এবং কেন সেগুলো এতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, তা একবার দেখে নেওয়া যাক:
আকাশ থেকে হামলা
সবচেয়ে নিখুঁত উপায়টি হলো—ড্রোন লক্ষ্যবস্তু থেকে কয়েকশ মাইল দূরে থাকতেই আগাম সতর্কীকরণ বা রাডার বিমান দিয়ে তা শনাক্ত করা। এরপর এফ-১৬-এর মতো ফাইটার জেট পাঠিয়ে প্রায় ৬ মাইল দূর থেকেই ড্রোনটিকে ভূপাতিত করা হয়।
এই পদ্ধতি বেশ সাশ্রয়ী হলেও, বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো সবসময় হাতের কাছে পাওয়া যায়নি। এনবিসি নিউজের মতে, এত দূর থেকে ড্রোন শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে আগাম সতর্কীকরণ বিমানগুলো প্রয়োজন, ইরান অত্যন্ত চালাকির সাথে সেগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ভূমিভিত্তিক রাডার সিস্টেমও ড্রোন শনাক্ত করতে পারে, তবে ড্রোনগুলো খুব নিচ দিয়ে উড়লে পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির কারণে রাডারের পক্ষে সেগুলোকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে ড্রোন মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা 'কয়োটে' নামের একটি বিশেষ ভূমিভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটি প্রায় ৯ মাইল দূর পর্যন্ত ড্রোনকে আটকে দিতে পারে।
দুটি কয়োটে রকেটের দাম প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ডলার, যা একটি ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের দামের প্রায় সাত গুণ! তারপরও অন্যান্য ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় এটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কিন্তু কার্যকর ও সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব কম সংখ্যক কয়োটে রকেট কিনেছে। ফলে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যখন এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়, তখন সৈন্যদের প্রায় প্রতিদিনই এই সীমিত সংখ্যক সিস্টেমগুলো এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে স্থানান্তর করে ব্যবহার করতে হতো।
জাহাজ-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা
ড্রোন মোকাবিলায় ব্যবহৃত দূরপাল্লার ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ এগুলো মূলত বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার জন্য তৈরি, ড্রোনের জন্য নয়। নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার জাহাজের রাডার সিস্টেম ৩০ মাইল দূর থেকে ড্রোন শনাক্ত করতে পারে এবং স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল ২ (এসএম-২) ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে সেটি ভূপাতিত করতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়, যার দাম প্রায় ৪.২ মিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ একটি ইরানি শাহেদ ড্রোনের দামের প্রায় ১২০ গুণ!
আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে বর্তমান যুদ্ধকৌশলের এই অসামঞ্জস্যতা শুরু হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে। তখন ধারণা করা হয়েছিল যে, ভবিষ্যতের হুমকিগুলো হবে দ্রুতগতির এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ঝাঁকে ঝাঁকে সস্তা ড্রোন নয়। খরচ কম হওয়ায় ইরান প্রায়ই একসাথে একাধিক শাহেদ-১৩৬ ড্রোন উৎক্ষেপণ করে, যা ১ হাজার ৫০০ মাইল পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ভূমিভিত্তিক অ্যান্টি-মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
মার্কিন সেনাবাহিনীর মূল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো প্যাট্রিয়ট। এটি প্রায় ২৭ মাইল দূর থেকেও ড্রোন ভূপাতিত করতে পারে। তবে দূরপাল্লার এই ব্যবস্থাগুলোই সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
তবুও দামি লক্ষ্যবস্তুকে রক্ষা করতে এই বিপুল খরচ করাটা যৌক্তিক হতে পারে। বিশেষ করে কাতারের একটি ঘাঁটিতে থাকা প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারের রাডার এবং জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে থাকা ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সেন্সরের মতো সম্পদের সুরক্ষায়, যা সহজে মেরামত করা বা পুনরায় কেনা সম্ভব নয়।
ভূমিভিত্তিক বন্দুক ব্যবস্থা
একেবারে শেষ অস্ত্র হিসেবে ভূমিভিত্তিক বন্দুক ব্যবস্থার কথা বলা যায়। ড্রোন যখন লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছে চলে আসে, তখন 'সেঞ্চুরিয়ন সি-র্যাম'-এর মতো অস্ত্রগুলো দ্রুত গুলি ছুড়ে সেটি ভূপাতিত করতে পারে। এটি সাশ্রয়ী হলেও খুব স্বল্প পাল্লার কারণে সবসময় সেরা বিকল্প নয়।
ইন্টারসেপ্টর ড্রোন
ড্রোনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ হলো এআই চালিত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন। 'মেরোপস সার্ভেয়র'-এর মতো ইন্টারসেপ্টর ড্রোন স্বল্প দূরত্বে থাকা শত্রুর ড্রোন শনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে সক্ষম। একটি মেরোপস ড্রোনের দাম প্রায় ৩০ হাজার ডলার, যা একটি ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের চেয়ে সামান্য কম।
গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিটের প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানি ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের সাথে মিলে এই মেরোপস সিস্টেম তৈরি করেছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মেরোপস ইউনিট পাঠিয়েছে। তবে এগুলো এখনও ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ড্রোন ভূপাতিত করার খরচ কমানোর অন্য প্রচেষ্টাগুলো খুব একটা কাজে আসেনি। পেন্টাগন লেজার অস্ত্রের ওপর ১০০ কোটিরও বেশি ডলার বিনিয়োগ করলেও এই সিস্টেমগুলো এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
তবে খরচের এই বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা মহলের আসল ভয় মজুত থাকা অস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে। 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ'-এর টম কারাকো বলেন, 'আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাচ্ছে যে আমাদের এই অস্ত্রগুলো ফুরিয়ে যাবে। এমন নয় যে আমরা এগুলো কেনার সামর্থ্য রাখি না, বরং পুনরায় তৈরি করার আগেই বর্তমান মজুত শেষ হয়ে যাবে।'
