হরমুজে বিশৃঙ্খলা ও লেবাননে সংঘর্ষ; ভেস্তে যেতে পারে ট্রাম্পের শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টা
শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং ইসরায়েল লেবাননের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘটা করে বলা আসন্ন শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এক ঘোষণায় জাহাজগুলোকে জানিয়েছে, এই জলপথটি সামুদ্রিক যাতায়াতের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাহাজ মালিকরা জানিয়েছেন, একটি সুপারট্যাঙ্কারে গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মুখপাত্র মেহেদি তাবাতাবায়ি এক বিবৃতিতে বলেন, 'আস্থা ভঙ্গ এবং এই বড় ছাড়টিকে প্রচারণার উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করায় প্রণালিটি পুনরায় বন্ধ করা হলো।'
শনিবার বিকেলে ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতি জারি করে জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে নোঙর না ছাড়ার জন্য সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, প্রণালির কাছাকাছি আসাকে 'শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা' হিসেবে গণ্য করা হবে এবং লঙ্ঘনকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শনিবার অজ্ঞাতনামা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানকে জলপথটি পুনরায় খুলতে বাধ্য করতে সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ট্রাম্প শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, 'তারা বছরের পর বছর ধরে যেমন করে এসেছে, তেমনভাবেই আবারও প্রণালিটি বন্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না।'
সাত সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বোমাবর্ষণ শুরু করার আগ পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খোলা ছিল। ট্রাম্প আরও বলেন, 'দিনের শেষ নাগাদ আমরা কিছু তথ্য পাব। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি এবং কঠোর অবস্থান নিচ্ছি।' জার্নালের প্রতিবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ করা হতো এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। শুক্রবার এটি খুলে দেওয়ার ঘোষণার ঠিক একদিন পরেই সেখানে এই বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। এর আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ জারি রাখাকে 'সামুদ্রিক দস্যুতা' বলে নিন্দা জানিয়েছিল।
লেবানন যুদ্ধবিরতিতে ফাটল
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতির সঙ্গে লেবাননের যুদ্ধবিরতির বিষয়টি যুক্ত ছিল, কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতিও এখন ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এগিয়ে আসা 'নাশকতাকারীদের' ওপর হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার যে ক্রমবর্ধমান আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তাতে পানি ঢেলে দিয়েছে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েল যেকোনো পরিকল্পিত বা আসন্ন হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে। শনিবার ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি 'সন্ত্রাসী সেলে' হামলা চালায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো জানিয়েছেন, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলায় একজন ফরাসি সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং এর জন্য তিনি হিজবুল্লাহকে দায়ী করেছেন।
ট্রাম্প শনিবার জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে 'খুব ভালো আলোচনা' চলছে। একদিন আগে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের 'পারমাণবিক ধূলিকণা' অর্থাৎ ইউরেনিয়াম পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।
কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের কাছে 'নিজ দেশের মাটির মতোই পবিত্র' এবং এটি কোনো অবস্থাতেই কোথাও হস্তান্তর করা হবে না।
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য যে গতি তৈরি হয়েছিল, তা শনিবার ইরানের সমালোচনার মুখে থমকে যায়। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী জানিয়েছে, আইআরজিসি-র গানবোট একটি ট্যাঙ্কারের কাছে গিয়ে গুলিবর্ষণ করেছে, তবে জাহাজ ও ক্রুরা নিরাপদ আছেন। ওমান উপকূলে অন্য একটি কন্টেইনার জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জাতীয় সেনাবাহিনী দিবস উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'আমাদের নৌবাহিনী শত্রুদের নতুন পরাজয়ের তিক্ততা আস্বাদন করাতে প্রস্তুত।' ইরানের প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ বলেছেন, ইরান প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তারা হয় আলোচনার টেবিলে নয়তো রণক্ষেত্রে তাদের অধিকার আদায় করবে।
শনিবার বেশ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও পথ পরিবর্তন করে ফিরে যায়। তবে কিছু জাহাজ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কাতারি ও সৌদি তেলবাহী 'এফপিএমসি সি লর্ড' নামক একটি ট্যাঙ্কারকে ওমান উপসাগরের দিকে যেতে দেখা গেছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্স বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন যে, 'বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি চুক্তি হতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী বা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর হতে পারে।'
চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তি
শুক্রবার ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে এবং দেশটির সঙ্গে আলোচনার 'বেশিরভাগ মূল পয়েন্ট' এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তবে ওই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি পুনরায় ইরানে হামলা শুরু করতে পারেন।
তিনি বলেন, 'হয়তো আমি এর মেয়াদ আর বাড়াব না; ফলে আপনাদের আবারও অবরোধের মুখে পড়তে হবে এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আবারও বোমা ফেলা শুরু করতে হতে পারে।'
গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার সরাসরি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছিল। এরপর শুক্রবার ট্রাম্পের এই মন্তব্য এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের ঘোষণা—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই পক্ষ পর্দার আড়ালে একটি চুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধের প্রভাবে ইরান অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে আঘাত করেছিল, যা একটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি করেছিল।
সাম্প্রতিক এই অগ্রগতির ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশায় তেল, জ্বালানি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হওয়া দামের সমস্ত বৃদ্ধিকে প্রায় মুছে ফেলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ডিজেলের দামও কমেছে।
বাজারের এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যৎ দামের পাশাপাশি বাস্তব বিশ্বের তেলের দামও লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। শুক্রবার 'ডেটেড ব্রেন্ট'—যা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের দাম হিসেবে বিবেচিত—১১ মার্চের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। যুদ্ধ শীঘ্রই শেষ হতে পারে এমন অনুমানের ভিত্তিতে শেয়ারবাজারেও চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেছে।
অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে—একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে যেখানে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা ২০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করে দেবে।
তবে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড় দেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বারবার 'না' বলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
