টাইপ-১ ডায়াবেটিস: ‘সস্তা’ মেটফরমিনেই কমতে পারে ইনসুলিন-নির্ভরতা
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এবার তাদের জন্য আশার খবর দিল নতুন একটি গবেষণা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য ব্যবহৃত সস্তা ওষুধ 'মেটফরমিন' টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন নেওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিস মূলত একটি 'অটোইমিউন' (স্বয়ংক্রিয় রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ত্রুটি) অবস্থা। এর ফলে মানুষের অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন না থাকলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই রোগীদের ইনসুলিন ইনজেকশনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
গবেষণার সহ-প্রধান ও এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (হরমোন বিশেষজ্ঞ) ডা. জেনিফার স্নেথ বলেন, 'টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করা) এখন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে শুধু রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণই কঠিন হয় না, বরং হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ভোগা রোগীদের স্বাস্থ্য জটিলতা ও মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ এই হৃদরোগ।'
এই সংকট সমাধানে আশার আলো দেখাচ্ছে গারভান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের এক গবেষণা। তারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত ওষুধ মেটফরমিন নিয়ে কাজ করেছেন।
চমকপ্রদ ফল
এই গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অংশ নেন। ছয় মাস ধরে তাদের অর্ধেককে মেটফরমিন এবং বাকি অর্ধেককে প্লাসিবো (ওষুধের মতো দেখতে, কিন্তু ওষুধ নয়) দেওয়া হয়। রোগীদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মাপতে গবেষকেরা উন্নত 'ক্ল্যাম্প' (clamp) পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
গবেষণার ফল ছিল চমকপ্রদ। দেখা যায়, মেটফরমিন আশানুরূপভাবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়নি। কিন্তু যারা মেটফরমিন নিয়েছে, তাদের প্রতিদিন গড়ে ১২ শতাংশ ইনসুলিন কম লেগেছে। একই সঙ্গে তাদের রক্তে শর্করার মাত্রাও একদম স্থিতিশীল ছিল। গবেষণাটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার কমিউনিকেশনস'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এটিই প্রথম কোনো গবেষণা, যেখানে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ওপর মেটফরমিনের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা তাদের নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মিলিগ্রাম মেটফরমিন বা প্লাসিবো গ্রহণ করেছিলেন। ২৬ সপ্তাহ পর দেখা যায়, মেটফরমিন গ্রহণকারীদের দৈনিক ইনসুলিনের মাত্রা প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১০ ইউনিট কমেছে। অথচ প্লাসিবো গ্রহণকারীদের ইনসুলিনের মাত্রা উল্টো কিছুটা বেড়েছে।
ডা. স্নেথ বলেন, 'মেটফরমিন ব্যবহারে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে কোনো পরিবর্তন না এলেও, ১২ শতাংশ ইনসুলিন কম লাগাটা অনেক বড় অর্জন। ইনসুলিন জীবন রক্ষাকারী হলেও এটি নেওয়া শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বেশ কষ্টকর। খুব সস্তা ও সহজলভ্য একটি ওষুধ যে এই কাজে লাগতে পারে, তা সত্যিই দারুণ খবর।'
রহস্য অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ায়?
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে মেটফরমিনের মূল কাজ হলো যকৃতের গ্লুকোজ উৎপাদন কমানো এবং ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা (সেনসিটিভিটি) বাড়ানো। কিন্তু টাইপ-১-এর ক্ষেত্রে এটি একেবারেই ভিন্নভাবে কাজ করেছে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স একই থাকার পরও কেন ইনসুলিন কম লাগছে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গারভান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক জেরি গ্রিনফিল্ড বলেন, 'প্রায় এক শ বছর ধরে বিভিন্ন রূপে মেটফরমিন পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এটি ঠিক কীভাবে কাজ করে তা এখনো অজানা। আমরা ভেবেছিলাম, শরীর হয়তো ইনসুলিনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হবে বলেই ইনসুলিন কম লাগছে। কিন্তু প্রমাণ হয়েছে যে বিষয়টি তেমন নয়। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, মেটফরমিন ঠিক কীভাবে এই প্রভাব ফেলছে, তা খুঁজে বের করা।'
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, ওষুধটি হয়তো অন্ত্রের অণুজীব বা মাইক্রোবায়োমে প্রভাব ফেলছে।
ডা. স্নেথ বলেন, 'অন্ত্রের ওপর মেটফরমিন কাজ করে—এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের অন্ত্রের ফ্লোরায় (ব্যাকটেরিয়া) এটি কী পরিবর্তন আনে, তা নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি। এই রহস্যের জট খুললে টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মেটফরমিনের ব্যবহার আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।'
