হরমুজে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী অবরোধ, চীনের সামনে কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত চীনের সামনে এক জটিল কূটনৈতিক দ্বিধা তৈরি করেছে। হয় দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে বেইজিংকে; নাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে পরিণত হবে পারমাণবিক শক্তিধর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ অভিযানের সময় চীন মূলত পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় ছিল। বেইজিং ইরানের ওপর ব্যাপক বোমা হামলার সমালোচনা করেছে। আবার ইরানকে নিজের ইচ্ছার অধীন করতে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতাও লক্ষ করেছে, একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানো কমদামে ইরানি তেল ও গ্যাস আমদানি করে অর্থনৈতিক সুবিধাও ভোগ করেছে।
তবে সেই পরিস্থিতি এখন নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে এবং ইরানকে দেখাতে যে তাদের জোট এখনও কার্যকর, চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, যতক্ষণ না সব জাহাজ—এমনকি আমেরিকার আরব মিত্রদের জাহাজও—নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, ততক্ষণ প্রণালি বন্ধই থাকবে।
মার্কিন রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক হুভার ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জিনেব রিবোয়া এই উদীয়মান সংকটকে সরাসরি "চীনকে উদ্দেশ্য করে" বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, "বেইজিং বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইরানকে একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি হামলা সেই কাঠামোকে—ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা তার ফলশ্রুতিতে—ধ্বংস করছে। অথচ এটি চীনের আঞ্চলিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।"
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং—উভয়েরই 'কঠোর নেতৃত্বের' ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর আগেই দুই দেশ এক ধরনের নিম্নমাত্রার 'তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধসদৃশ' কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে উদ্যোগী হয়।
এরই অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রথমে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে কমান্ডো পাঠিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করেন। মাদুরো চীনের কাছে তেল বিক্রি করতেন এবং এর বিনিময়ে সামরিক সরঞ্জাম কিনতেন।
তবে চীন মাদুরোকে রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ক্যারিবীয় সাগর যুক্তরাষ্ট্রের 'পেছনের উঠান' হিসেবে বিবেচিত, সেখানে চীনের সামরিক উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ফলে মাদুরোকে রক্ষা করা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ এবং তেমন লাভজনকও নয়—কারণ ভেনেজুয়েলা থেকে চীন তার মোট তেলের মাত্র চার শতাংশ আমদানি করত। অস্ত্র বিক্রিও তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। চীনের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ আসে ইরান থেকে, তাও আবার আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে।
এর পাশাপাশি, ইরানের বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) শিল্প উন্নয়নে চীনের সঙ্গে গভীর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছেন শি জিনপিং। উচ্চপ্রযুক্তির চিপ উৎপাদনে এসব খনিজের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতিগুলো এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এই চিপগুলো কম্পিউটার গেম থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছুর জন্য অপরিহার্য। এমনকি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ইরান যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স সিস্টেম এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহ বহু যুদ্ধাস্ত্রে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বর্তমানে বিশ্বে পরিশোধিত বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন করে চীন এবং তারা এই নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে চায়। ২০২১ সালে বেইজিং ইরানের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে; যার মাধ্যমে শুধু তেল নয়, ইরানের বিরল খনিজ সম্পদেও চীনের নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়।
অনলাইন জ্বালানি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম অয়েলপ্রাইস ডটকম উল্লেখ করেছে, 'বিরল খনিজের কেন্দ্র' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ইরান তার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এর ফলে শি জিনপিং দেশটিকে কেবল 'নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত গ্যাস স্টেশন' হিসেবে দেখেন না।
অয়েলপ্রাইসের বিশেষজ্ঞদের মতে, "যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা সরাসরি এই সম্পদনির্ভর কৌশলগত অক্ষকে হুমকির মুখে ফেলছে।"
খনিজ সম্পদের বাইরেও, ইরানের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে চীনা কোম্পানিগুলো সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের টেলিফোন ও ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা, যাতে সরকার সম্ভাব্য ভিন্নমতাবলম্বীদের নজরদারিতে রাখতে পারে।
জানুয়ারিতে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার চীনা প্রযুক্তি—বিশেষ করে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা—ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করে হত্যা বা গ্রেপ্তার করেছে।
এছাড়া, চীনের 'গ্রেট ফায়ারওয়াল' প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান পুরো দেশের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়, যাতে কঠোর দমন-পীড়নের খবর বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, "ইরান একা একা এই সেন্সরশিপ অবকাঠামো তৈরি করেনি; এতে চীনের সহায়তা রয়েছে।"
তাদের মতে, "এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ট্র্যাক করা, ইমেইল পুনর্গঠন, ট্রাফিক ব্লক করা এবং এমনকী বিভিন্ন ওয়েব পেজের তথ্য বিকৃত করে সরবরাহ করা সম্ভব। সরকারগুলো নাগরিকদের নজরদারি, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং অস্থিরতার সময় জনগণকে বিচ্ছিন্ন রাখতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।"
এই সব কৌশলগত বিনিয়োগ এখন যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন অভিযানের মুখে হুমকির সম্মুখীন। একই সঙ্গে চীনের ধীরে ধীরে অর্জিত কূটনৈতিক সাফল্যও ভেঙে পড়তে পারে। চীনই দীর্ঘদিনের শত্রু ইরান ও সৌদি আরবকে আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে রাজি করিয়েছিল। এছাড়া চীন ইরানকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা-এসসিও'তে অন্তর্ভুক্ত করে। 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের আওতায় এনে ইরানের ভেতর দিয়ে মধ্য এশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বাণিজ্য পথ বিস্তারের কাজও শুরু করেছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ইরানের মতো মিত্রদের কাছে নিজেদের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে চীন কী করতে পারে? হামলার পরপরই চীন আইনি ভাষ্য ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া জানায়। জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেন, "ইরানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সম্মান করতে হবে। চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রস্তুত।"
কিন্তু ১৪ এপ্রিল, হরমুজ প্রণালি ও ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ কার্যকর হতে শুরু করলে চীনের ভাষা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, "চীনা জাহাজগুলো প্রণালির ভেতরে-বাইরে চলাচল অব্যাহত রেখেছে। ইরানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ও জ্বালানি চুক্তি রয়েছে, যা আমরা সম্মান করব। অন্যদের আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানাই। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে এবং তারা আমাদের জন্য তা উন্মুক্ত রেখেছে।"
স্নায়ুযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমুদ্রে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান আর দেখা যায়নি। ১৯৬২ সালে কিউবা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল, যাতে সোভিয়েত জাহাজগুলো কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে দিতে না পারে। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত জাহাজগুলো পিছু হটে এবং গোপন সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত এড়ানো হয়। গোপন সমঝোতার আলোকে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কে মোতায়েন করা তার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেয়।
বর্তমান হরমুজ সংকট কি সেই পথেই যাবে, নাকি সরাসরি সংঘাতে রূপ নেবে? ভূরাজনীতি ও জ্বালানি বিশ্লেষক জো ওয়েবস্টার সতর্ক করে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্রকে চীনের সমর্থন সরাসরি আমেরিকান হতাহতের কারণ হতে পারে। যদি ইরানকে চীনের সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা—যুক্তরাষ্ট্রের বিমানচালক বা নাবিকদের মৃত্যুর কারণ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে?"
প্রশ্নটি সহজ নয়—বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক: ড্যানিয়েল উইলিয়ামস ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ও মায়ামি হেরাল্ডের সাবেক বৈদেশিক সংবাদদাতা এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক গবেষক। তাঁর বই 'ফরসেকেন: দ্য পারসিকিউশন অব ক্রিশ্চিয়ানস ইন টুডেজ মিডল ইস্ট' প্রকাশ করেছে ও/আর বুকস। বর্তমানে তিনি রোমে বসবাস করছেন।
