ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ২৮ বিলিয়ন ডলার: জনকল্যাণের বদলে সামরিক খাতে অগ্রাধিকার ট্রাম্পের
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে এক সভায় সমর্থকদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, ডে-কেয়ার বা স্বাস্থ্য বিমার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের আর্থিক সহায়তা দিতে পারছে না। গত ১ এপ্রিল হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে তিনি অংশীজনদের বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের কাছে সামরিক খাতের খরচ মেটানোই সবথেকে বড় অগ্রাধিকার।
ট্রাম্পের মতে, জনকল্যাণমূলক এই ব্যয়গুলো মেটানোর দায়িত্ব মূলত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যগুলোর। তিনি বলেন, 'আমাদের একটি বিষয়ই নিশ্চিত করতে হবে: সামরিক সুরক্ষা। আমাদের দেশ রক্ষা করতে হবে।'
অথচ যুদ্ধবিরতির আগে ইরানের সাথে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ২৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এনবিসি নিউজের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অর্থ দিয়ে সাধারণ আমেরিকানদের জীবনে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের এই ২৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে এক বছরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অন্তত ২০ লাখ শিশুর ডে-কেয়ার সুবিধার খরচ মেটানো যেত। এছাড়া, এই অর্থ দিয়ে ১২ লাখ মানুষের ঘর ভাড়া অথবা 'মেডিকেড' প্রোগ্রামের আওতায় ৩০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য বিমার ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হতো।
ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন। তিনি বাজেট দপ্তরের পরিচালক রাসেল ভটকে দেওয়া নির্দেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'ডে-কেয়ারের জন্য কোনো টাকা পাঠাবেন না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই খরচ বহন করতে পারবে না। এটি অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আমরা একটি বড় দেশ, আমাদের ৫০টি অঙ্গরাজ্য আছে। আমরা বর্তমানে যুদ্ধে লিপ্ত। তাই অঙ্গরাজ্যগুলোকেই ডে-কেয়ারের দায়িত্ব নিতে হবে এবং খরচও তাদেরই দিতে হবে।'
ট্রাম্পের মতে, এই ব্যয় মেটানোর জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে প্রয়োজনে কর বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, 'আমাদের পক্ষে ডে-কেয়ার, মেডিকেড বা মেডিকেয়ারের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সামলানো সম্ভব নয়। ফেডারেল পর্যায় থেকে এটি হবে না। আমাদের একটি বিষয়ই নিশ্চিত করতে হবে: সামরিক সুরক্ষা। আমাদের দেশ রক্ষা করতে হবে।'
ট্রাম্পের বক্তব্যের ভিডিও প্রকাশিত হলে তা নিয়ে সমালোচনা দেখা দেয়। এর জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে হওয়া কোটি কোটি ডলারের দুর্নীতি নির্মূলের কথা বুঝিয়েছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডা আমেরিকান পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে।'
তবে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা ডে-কেয়ারের (শিশুযত্ন) খরচের সঙ্গে ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের ব্যয়ের তুলনা করেন, যেখানে গত মাসে অভিযানের প্রথম ছয় দিনেই খরচ ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রো খান্না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, 'ট্রাম্প বলছেন আমরা ইরান যুদ্ধের খরচ দিতে পারব কিন্তু ডে-কেয়ারের নয়। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ইরানে আপনি যে বিলিয়ন ডলার অপচয় করেছেন, তা দিয়ে প্রতিটি আমেরিকান পরিবারকে মাত্র ১০ ডলারে ডে-কেয়ার সুবিধা দেওয়া সম্ভব ছিল এবং সেখানে কর্মীদের ঘণ্টায় ২৫ ডলার মজুরি দেওয়া যেত।'
নিউ জার্সির সিনেটর অ্যান্ডি কিম আক্ষেপ করে বলেন, 'এই যুদ্ধের মাত্র তিন সপ্তাহের খরচ দিয়ে আমরা মেডিকেডের আওতায় থাকা প্রতিটি প্রবীণ নাগরিকের এক বছরের দাঁত, কান ও চোখের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারতাম। এটি সম্ভব ছিল, কিন্তু ট্রাম্প সেটি করতে চান না।'
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসেই ট্রাম্প প্রশাসন ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ইলিনয়, মিনেসোটা এবং নিউ ইয়র্কের মতো পাঁচটি ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যের ডে-কেয়ার তহবিল স্থগিত করেছে। বিশেষ করে মিনেসোটার ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হলেও রাজ্য সরকারের তদন্তে দেখা গেছে সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
দুর্নীতি দমনে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে প্রধান দায়িত্ব দিয়েছেন ট্রাম্প, যিনি সম্প্রতি একটি নতুন 'অ্যান্টি-ফ্রড টাস্কফোর্স' গঠন করেছেন।
