আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানে আবার হামলা শুরু করার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের ওপর আবারও সীমিত সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টারা। সরকারি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) ট্রাম্প এই ধরণের বেশ কিছু বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প চাইলে পূর্ণ মাত্রায় বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারেন। তবে, এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়ানোর প্রবণতার কারণে এমন পদক্ষেপের সম্ভাবনা কম।
এর বদলে তিনি একটি সাময়িক নৌ-অবরোধের পথ বেছে নিতে পারেন এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, যাতে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে তারা পাহারার দায়িত্ব নেয়।
পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প রোববার দিনের বেশিরভাগ সময় ফ্লোরিডার ডোরালে তার রিসোর্টে কাটান। সেখানে তিনি ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে কথা বলেন, গলফ খেলেন এবং উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করেন। সহযোগীরা জানিয়েছেন, নৌ-অবরোধের ঘোষণা এবং ইরানের অবকাঠামোতে হামলার নতুন হুমকি দিলেও ট্রাম্প এখনও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রেখেছেন।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'আমি এটি করতে চাই না; তবে তাদের পানি, পানি শোধন প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানা অত্যন্ত সহজ।'
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, 'ইরানের হুমকি বন্ধ করতে প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচক্ষণতার সাথে সব ধরণের বিকল্প হাতে রেখেছেন। যারা দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে বলছেন যে তারা জানেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরবর্তীতে কী করবেন, তারা মূলত অনুমাননির্ভর কথা বলছেন।'
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে চায় এবং মার্কিন প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি প্রস্তাব এখনো বহাল আছে।
অন্যদিকে, ইরানি প্রতিনিধিদলের জ্যেষ্ঠ সদস্য রেজা আমিরি মোকাদ্দাম এই আলোচনাকে একটি প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'ইসলামাবাদ আলোচনা এমন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছে যা—পারস্পরিক আস্থা ও সদিচ্ছা থাকলে সব পক্ষের স্বার্থে একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে পারে।'
মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চূড়ান্ত শর্তগুলো তুলে ধরেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালি কোনো টোল ছাড়াই পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখা, সকল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং এর জন্য ব্যবহৃত স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা, সবটুকু উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা, আঞ্চলিক মিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামো মেনে নেওয়া এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো 'প্রক্সি' গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করা।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনা মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে ইরানের অস্বীকৃতির কারণেই ভেস্তে গেছে বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—সেটি নিশ্চিত করাই ছিল এই যুদ্ধ শুরু করার অন্যতম প্রধান কারণ।
মার্কিন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতে, ট্রাম্পের পরবর্তী যেকোনো সিদ্ধান্তেই বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। পূর্ণমাত্রায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্রের মজুত আরও কমে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সন্দিহান ভোটারদের কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট আরও বেশি সমালোচনার মুখে পড়বেন।
অন্যদিকে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেওয়া হলে তা তেহরানের বিজয় হিসেবেই গণ্য হবে।
কিছু কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষক হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তকে ট্রাম্পের সামনে থাকা 'সেরা' বা 'সবচেয়ে কম ক্ষতিকর' বিকল্প হিসেবে প্রশংসা করেছেন। ইরান সরকারের আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে তেল ও গ্যাস খাত থেকে। একটি সফল নৌ-অবরোধ ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল রপ্তানিকে স্থবির করে দেবে এবং মার্কিন মিত্রসহ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এটি বুঝিয়ে দেবে, তেহরান এই জলপথকে জিম্মি করে রাখতে পারবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক এবং পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ম্যাথিউ ক্রোয়েনিগ বলেন, 'আমরা দেখেছি এই অবরোধ কৌশল ভেনিজুয়েলায় সফল হয়েছে এবং ট্রাম্পের সামনে এখানেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সুযোগ আছে। আমি মনে করি, এটি ইরান সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর এবং তাদের একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলার অন্যতম কার্যকর উপায়।'
তবে এই নৌ-অবরোধের নিজস্ব কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে।
কয়েক দশকের পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সপ্তাহব্যাপী তীব্র বোমাবর্ষণের মুখেও ইরান সরকার এখনও নতি স্বীকার করেনি; বরং তেহরান এখনও অনড় অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের উপকূল সংলগ্ন ওই সরু প্রণালিতে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজগুলো যেকোনো সময় আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে পারে, যা মোকাবিলা করার জন্য খুব একটা সময় পাওয়া যাবে না।
এই যুদ্ধ চলাকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। শুরুতে তিনি হরমুজ প্রণালিকে কোনো বড় সমস্যাই মনে করেননি, অথচ এখন তিনি এই জলপথের ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথ এই প্রণালিটি ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় মিত্র দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছে এবং তারা ট্রাম্পের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।
দেশের ভেতরেও ট্রাম্প ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, জ্বালানি তেলের দাম আরও কিছুদিন চড়া থাকতে পারে। এটি মূলত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেডি ভ্যান্স যখন ইসলামাবাদে ম্যারাথন আলোচনা শেষ করে ফিরছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিয়ামিতে একটি 'আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ' (ইউএফসি) অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
রোববার ফক্স নিউজে কথা বলার সময় যুদ্ধ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের খবর প্রচারের ধরণ নিয়েও তিনি তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, সংবাদমাধ্যমগুলো এই যুদ্ধের একপেশে খবর প্রচার করছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ট্রাম্পের উপদেষ্টা, মিত্র এবং করপোরেট নেতাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা স্টিভ মুর বলেন, 'আমি হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়েছি যে অর্থনৈতিক, জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো মূল্যে এবং অবিলম্বে এই প্রণালি (হরমুজ) সচল করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবাহ রক্ষা করার ক্ষমতা আমাদের আছে এবং আমাদের অবশ্যই তা ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় পুরো বিশ্ব অর্থনীতি একটি বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়তে পারে।'
রোববার ট্রাম্প এই সাময়িক কষ্টকে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য একটি প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবে অভিহিত করেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফ্রেড ফ্লেইজ বলেন, ইসলামাবাদে ইরানের পাঠানো বিশাল প্রতিনিধিদল এটাই প্রমাণ করে যে একটি কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন, ইরানের হাতে আর কোনো তাস নেই। এই সংঘাত মাত্র কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে। এর ফলাফল কী হবে তা এখনই বলা কঠিন, তবে বিষয়টি আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে।'
