টানাপোড়েন, উত্তেজনা ও রক্তাক্ত সম্পর্কের ইতিহাস: যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের পেছনের দীর্ঘ ছায়া
ইরানের ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণ হচ্ছে, যার জবাবে তেহরান-ও পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানছে, একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করছে—তখন বর্তমান সময়কে দুই দেশের সম্পর্কের সর্বোচ্চ নিম্ন অবস্থা হিসেবে দেখাটাই যৌক্তিক।
কিন্তু এই বৈরিতা নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব কয়েক দশক ধরে চলে আসছে—অন্তত ১৯৫৩ সালের আগস্ট থেকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক-কে উৎখাতে সহায়তা করেছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয় ইরানের শাহের দীর্ঘ ও দমনমূলক শাসনকে, যার নিরাপত্তা বাহিনী বহু বছর ধরে ইরানি নাগরিকদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়।
১৯৭৯ সালের নভেম্বরে ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বিশেষভাবে শত্রুতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়।
১৯৮৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানকে "সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র" হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আসছে, এই অভিযোগ করে যে ইরানের সরকার সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে।
কয়েক দশকের দীর্ঘ এই পালাবদলে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের কিছু বড় ঘটনা দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র পার্থক্য তুলে ধরে, আবার কিছু মুহূর্ত এমনও ছিল যা পুনর্মিলনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
১৯৫৩: মোসাদ্দেককে উৎখাত
১৯৫১ সালে ইরানের পার্লামেন্ট নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোসাদ্দেককে নির্বাচিত করে। তিনি আইনপ্রণেতাদের নেতৃত্ব দেন অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দিতে—ব্রিটিশ মালিকদের বহিষ্কার করে তেল বিক্রির মুনাফা ইরানি জনগণের উন্নয়নে ব্যয় করার লক্ষ্যে।
যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করেছিল, এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং ইরান সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ঢুকে যাবে। ব্রিটেনও সস্তায় ইরানি তেলের সরবরাহ হারানোর আশঙ্কা করছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জন্য মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। এরপর সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযান "অপারেশন অ্যাজাক্স"-এর মাধ্যমে ইরানের শাহকে প্ররোচিত করা হয় মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করতে এবং বলপ্রয়োগে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। পরে সিআইএ-র পছন্দমতো পশ্চিমাপন্থী এক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় বসানো হয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহের পতন ও জিম্মি সংকট
ইরানের শাহ—রেজা পাহলভির স্বৈরশাসনে ইরানের জনগণ সামাজিক–অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণে ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। তার ২৫ বছরের ওই শাসনকাল আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা দিলেও সামাজিক অসন্তোষগুলো এই সময়েই দানা বাধতে শুরু করে।
রাষ্ট্রের সম্পদ লুটে পাহলভি বিপুল বিত্ত অর্জন করেন এবং মার্কিন সহায়তা সামরিক খাতে ব্যয় করেন—যখন অনেক ইরানি দারিদ্র্য সীমায় ছিল। ভিন্নমত প্রায়ই সাভাক নামের কুখ্যাত নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে দমন করা হতো। তবে জনতার বিপ্লব সফল হলে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশত্যাগ করেন।
এর দুই সপ্তাহ পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি নির্বাসন থেকে ফিরে এসে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেন।
১৯৭৯ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেন। এতে ক্ষুব্ধ ইরানি শিক্ষার্থীরা ৪ নভেম্বর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে। এরপর ১৯৮০ সালের ৭ এপ্রিল কার্টার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। দুই সপ্তাহ পর জিম্মিদের উদ্ধারে মার্কিন সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়, বিমান ভূপাতিত হয়ে ৮ মার্কিন সেনাও নিহত হয়।
রেজা শাহ ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে মিশরে মারা যান, আর ৪৪৪ দিন পর ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন জিম্মিদের মুক্তি দেয় ইরান।
১৯৮০–১৯৮৮: ইরাকের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাক ইরান আক্রমণ করে—যা দুই দেশের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ধর্মীয় বিভাজনের সরাসরি বিস্ফোরণ হিসেবে দেখা হয়। ইরাক ছিল সুন্নি মুসলিম নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র, যদিও দেশটির জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিয়া মুসলিম; বিপরীতে ইরান ছিল প্রধানত শিয়া নেতৃত্ব ও শিয়া জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র।
এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। বিশেষ করে, তেলনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্বেগ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা। একই সঙ্গে, তাদের কৌশলগত মিত্র সৌদি আরব যেন এই সংঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও ছিল ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের প্রতি কার্যত সমর্থন জানায় এবং তাকে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে। এর ফলে যুদ্ধ চলাকালে ইরাক ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও, যুক্তরাষ্ট্র তা প্রায় উপেক্ষা করে—এক ধরনের কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এ সময় তাদের প্রচলিত অবস্থান—অর্থাৎ অবৈধ ও অমানবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতা—শিথিল করেন। কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দেন, এমন অবস্থান নিলে তা "ইরানের প্রচারণাকে শক্তিশালী করে সেটা ইরাকবিরোধী অবস্থানকে উসকে দিতে পারে।"
অবশেষে ১৯৮৮ সালে যুদ্ধের অচলাবস্থায় শেষ হয়। ভ্রাতৃঘাতী এই লড়াইয়ে কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি। তবে এই দীর্ঘ আট বছরের সংঘাতের মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ: যেখানে উভয় দেশের পাঁচ লাখের বেশি সেনা সদস্য এবং প্রায় এক লাখ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়, যা মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৮১–১৯৮৬: গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের
১৯৮৪ সালে ইরানকে "সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র" হিসেবে ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু তখন ইরান ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িত থাকায়, তাদের সামরিক বাহিনী অস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক যানবাহনের যন্ত্রাংশের মারাত্মক সংকটে পড়ে, ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া একপ্রকার কঠিন হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসন কৌশলগতভাবে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ইরান বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে প্রকাশ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিয়েই ওয়াশিংটন গোপন পথে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়—যা ১৯৮১ সাল থেকেই কার্যকর হতে শুরু করে।
এই গোপন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়, যার শেষ চালানটি পৌঁছে ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে। কিন্তু একই বছরের নভেম্বরে একটি লেবানিজ সাময়িকী এই গোপন লেনদেনের তথ্য ফাঁস করে দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝড় তোলে।
এই ঘটনাই পরবর্তীতে "ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারি" নামে পরিচিতি পায়। তদন্তে উঠে আসে, রিগ্যান প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইরানের কাছ থেকে অস্ত্রের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই অর্থ গোপনে লাতিন আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়াতে সমাজতন্ত্রবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী—কনট্রাদের—হাতে তুলে দেন। এই অবৈধ অর্থায়ন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও কংগ্রেসের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন ছিল, যা প্রশাসনের নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
১৯৮৮: ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে মার্কিন নৌবাহিনী
১৯৮৮ সালের ৮ জুলাই সকালে পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহলরত মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস ভিনসেনস ইরানি গানবোটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং সেই অবস্থায় ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করে।
এই গোলাগুলির সময় কিংবা তার ঠিক পরপরই, ভিনসেনসের ক্রুরা একটি যাত্রীবাহী এয়ারবাস বিমানকে ভুল করে ইরানের এফ-১৪ যুদ্ধবিমান হিসেবে শনাক্ত করে। তারা সেটিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়ে, এতে বিমানটি ভূপাতিত হয়—যার ফলে বিমানে থাকা ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনাকে "দুঃখজনক ও অনুতাপজনক দুর্ঘটনা" হিসেবে বর্ণনা করলেও, ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে এটি ছিল ইচ্ছাকৃত হামলা। দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৩১.৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতেও সম্মত হয়।
১৯৯৭–১৯৯৮: সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা
১৯৯৭ সালের আগস্টে মধ্যপন্থী সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন—যা তেহরানের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিবর্তনকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তিনি সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তেহরানের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সরাসরি উভয় সরকারের মধ্যে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
এর কিছুদিন পর, ১৯৯৮ সালের জানুয়ারির শুরুতে খাতামি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে "আমেরিকান জনগণের প্রতি সম্মান" জানান, সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে "অধ্যাপক, লেখক, গবেষক, শিল্পী, সাংবাদিক ও পর্যটক বিনিময়" কর্মসূচির প্রস্তাব দেন।
তবে এই ইতিবাচক বার্তা সত্ত্বেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খোমেনি এতে সম্মতি দেননি। ফলে দুই দেশের পারস্পরিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি এবং ক্লিনটনের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনাটিও হারিয়ে যায়।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে নতুন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে "শয়তানের অক্ষ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন—যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
@২০০২: পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ
২০০২ সালের আগস্টে ইরানের নির্বাসিত একটি গোষ্ঠী দাবি করে, ইরান গোপনে দুটি অঘোষিত স্থাপনায় পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের কাজ চালাচ্ছে।
এই তথ্য প্রকাশ পেলে তা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির (এনপিটি) শর্ত লঙ্ঘনের সামিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ চুক্তি অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তথ্য আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কাছে প্রকাশ করতে হয়।
এই গোপন স্থাপনাগুলোর একটি ছিল নাতাঞ্জ। এখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করা হয়েছিল—যা বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
২০০৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাইবার ইউনিটগুলো যৌথভাবে নাতাঞ্জ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে "স্টাক্সনেট" নামে পরিচিত একটি বিশেষভাবে তৈরি ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে আক্রমণ চালায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এই সাইবার আক্রমণের মুখে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি কিছুটা শ্লথ করলেও, সামগ্রিকভাবে ইরানের তথাকথিত 'পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের অগ্রগতি' থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ উদ্যোগই সফল হয়নি।
২০০৩: বুশ প্রশাসনের কাছে ইরানের বার্তা
২০০৩ সালের মে মাসে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নীরবে সুইস দূতাবাসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা "পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সংলাপ"-এর প্রস্তাব দেন, যেখানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—পারমাণবিক অস্ত্র, সন্ত্রাসবাদ, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ এবং ইরাকের স্থিতিশীলতা—আলোচনার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রেসিডেন্ট বুশ প্রশাসনের কট্টরপন্থীরা এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি, যদিও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল সংলাপের পক্ষে ছিলেন এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আল-কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের সঙ্গে সীমিতভাবে গোপন আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।
২০০৫ সালে কঠোরপন্থী নেতা মাহমুদ আহমেদিনিজাদ ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট বুশকে ১৮ পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠিয়ে নতুন উদ্যোগ নেন, কিন্তু সেটি ওয়াশিংটনে গুরুত্ব পায়নি। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সেটিকে কার্যত গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন।
২০১৫: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের চুক্তি সই
দশকের পর দশক ধরে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১৩ সাল থেকে সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।
দুই বছরের গোপন ও প্রত্যক্ষ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রথমে দ্বিপাক্ষিকভাবে এবং পরে অন্যান্য পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে যৌথভাবে যে চুক্তিতে পৌঁছায়, তা "জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন" (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত।
২০১৫ সালে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্য এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা কঠোরভাবে সীমিত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের মাধ্যমে তা তদারকির ব্যবস্থা করা হয়।
বিনিময়ে ইরান আন্তর্জাতিক ও মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অব্যাহতি পায়। এদিকে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা নিয়মিতভাবে নিশ্চিত করছিলেন যে ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলছে, তবুও ওবামার পরে হোয়াইট হাউসে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালের মে মাসে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
২০২০: কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড
২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি একটি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পর তিনিই ছিলেন ইরানের দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি।
তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, সোলাইমানি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে আসন্ন হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এর জবাবে ইরান ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠন–হামাস ইসরায়েলের ওপর এক দুঃসাহসী হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হয় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায়, যাতে বিপুল বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
এই সংঘাত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থনে ইসরায়েলের আক্রমণের মুখে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো—বিশেষ করে হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ—দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৫: ট্রাম্প ২.০ ও ইরান নীতি
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমদিকে ইরানের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক চুক্তি সই এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সমঝোতার সুযোগ দেখেছিলেন।
তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী স্টিভ উইটকফ-কে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বও দেন।
কিন্তু, গত বছরের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়, যা হোয়াইট হাউসকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করে।
২২ জুন ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়—যা পেন্টাগনের ভাষায় "গুরুতর ক্ষতি" সাধন করে।
এই যুদ্ধ ১২ দিন স্থায়ী হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো "সম্পূর্ণ ধ্বংস" হয়ে গেছে—যদিও তেহরান এ দাবি অস্বীকার করে।
২০২৬: উত্তেজনা থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ
২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের একাধিক পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ইরানে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়, যেখানে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করার বার্তা দিয়ে বলেন, আপনাদের জন্য "সহায়তা আসছে।"
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে "এপিক ফিউরি" নামের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানে বোমা হামলা শুরু করে।
প্রথম দফার হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতারা নিহত হন। এর জবাবে তেহরান উপসাগরজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়—ফলে সংঘাত দ্রুতই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়।
এই সংঘাতের দাবানল এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকট খাদ্য সংকটের দিকেও ধাবিত হচ্ছে।
লেখক: জেফ্রি ফিল্ডস আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, ইউএসসি ডর্নসাইফ কলেজ অব লেটার্স, আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস।
