ইরানের টিকে থাকার শক্তির অবমূল্যায়ন করেছেন ট্রাম্প, বেরিয়ে যাওয়াই এখন তার দায়
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সামরিক সাফল্যের নানা দাবি করা হলেও—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি—কেন তারা এই সংঘাত শুরু করল, তাদের লক্ষ্য কী এবং কীভাবে তারা এ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসবে।
ইরানি শাসনব্যবস্থা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় মধ্যপ্রাচ্য এমন এক অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে নিমজ্জিত হয়েছে, যার শেষ কোথায় তা এখনো অনিশ্চিত।
এক মাস আগে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ শুরু করেন, তখন ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
তারা ধারণাও করেননি যে, তেহরান নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়ে পাল্টা জবাব দেবে—পারস্য উপসাগরজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাবে এবং ইসরায়েলকে গুরুতরভাবে আঘাত করবে।
তারা এটাও অনুমান করতে পারেননি যে তেহরান আংশিক বা পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে সংকট সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব পড়বে।
সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে তারা এই বিশ্বাসে পদক্ষেপ নিয়েছিল যে, আকাশ ও সমুদ্রপথে মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষমতার প্রদর্শন ইরানের ইসলামী সরকারকে দ্রুত নতি স্বীকারে বাধ্য করবে। তারা ধরেই নেন, যুদ্ধ হলে ইরানি জনগণ রাস্তায় নেমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য অনুকূল শাসনব্যবস্থা আনবে—যা বাস্তবে ঘটেনি।
এখন যখন সামরিক বিজয় ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই যেতে হবে। আর নেতানিয়াহুকেও তাতে রাজি হতে হবে।
কেন ইরান এতটা স্থিতিস্থাপক প্রমাণিত হলো
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের সরকার অভ্যন্তরীণ চাপ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ছিল, বিশেষ করে ব্যাপক জনবিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষের মৃত্যুর ঘটনায়।
একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে নিজেদের মিত্রগোষ্ঠী—বিশেষ করে হামাস ও হিজবুল্লাহ—ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পরিণতি সামলাতেও হিমশিম খাচ্ছিল তেহরান।
ট্রাম্পের প্রতি অনাস্থা থাকা সত্ত্বেও, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিল তেহরান। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রধান মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হাতের নাগালেই রয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন হামলা চালাল, তখন ইরান সরকারের সামনে ভিন্ন এক সুযোগ তৈরি হলো। সেটা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা নিজেদের স্থিতিস্থাপক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ।
ইরানের ক্ষমতা, শাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সামরিক কমান্ডার নিহত হলেও তা টিকে থাকতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক বৈরিতার মধ্যেও তারা এই সক্ষমতা দেখিয়ে এসেছে।
ধর্মতান্ত্রিক শাসন, বারবার জনবিক্ষোভ এবং নীতি-ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশটির ইসলামী সরকার টিকে আছে। এর পেছনে রয়েছে—
#শিয়া মুসলমানদের একাংশের মধ্যে বিপ্লবী ইসলামপন্থার প্রতি বিশ্বাস,
#আদর্শিক কঠোরতা ও বাস্তববাদী নমনীয়তার সমন্বয়,
#এবং একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক কাঠামো, যার অস্তিত্বই শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার সঙ্গে জড়িত।
অনেক ইরানি ইসলামী সরকারের পতন চাইলেও, অধিকাংশই তাদের সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। তারা চায় না যে ইরান বিদেশি শক্তির আগ্রাসন, ধ্বংস ও অপমানের শিকার হোক।
সহনশীলতার যুদ্ধ
এই কারণেই ইতিহাসের মতো এবারও অধিকাংশ ইরানি জনগণ বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
ইরান জানত, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারবে না। এজন্যই তেহরান 'মোজাইক ডিফেন্স' নামে অসম যুদ্ধকৌশল গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতা, যেমন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাশাপাশি নেতৃত্ব কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ করে, যাতে কেউ নিহত হলে দ্রুত তাঁর জায়গায় অধস্তনরা দায়িত্ব নিতে পারেন।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে রাশিয়া ও চীন দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ করে সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি চীন ইরানের তেল আমদানি করেও তেহরানকে আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। আবার রাশিয়া অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের অবস্থান সম্পর্কেও গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা দুর্বল হলেও, তারা এখনো এই যুদ্ধে তেহরানকে সহায়তা করতে পারবে। হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ইতোমধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। হুথিরা লোহিত সাগরে নৌ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টাও করতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ইরানি সরকার যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বিজয় থেকে বঞ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে এই সংঘাত এখন এক দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতা বা টিকে থাকার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
সমাধানের একমাত্র পথ চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান কতদিন এই যুদ্ধে জড়িয়ে থাকবে, তা অনিশ্চিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্র উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। ইরান পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও তাদের লক্ষ্য নিয়ে একমত হতে পারছে না।
যুদ্ধের ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি চুক্তিতে রাজি হতে পারেন।
কিন্তু, নেতানিয়াহু নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি ইরানের বর্তমান সরকারকে ধ্বংস করতে এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানকে দুর্বল করতে চান।
তবে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, এই যুদ্ধ সামরিক উপায়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। একমাত্র পথ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান। ফলে নেতানিয়াহুকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ওপরই বর্তাবে। ইতোমধ্যে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যেভাবেই যুদ্ধ শেষ হোক না কেন, ইরানই এগিয়ে আছে।
লেখক: আমিন সাইকল অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং আরব ও ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক। তার লেখা একটি বই 'ইরান রাইজিং: দ্য সারভাইভাল অ্যান্ড ফিউচার অব দ্য ইসলামিক রিপাবলিক' ইরানের টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
