ইরানে ‘চূড়ান্ত আঘাতের’ সামরিক পরিকল্পনা পেন্টাগনের, প্রস্তুত রাখা হয়েছে স্থলবাহিনীও
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে একটি 'চূড়ান্ত আঘাত' হানার জন্য সামরিক বিকল্পগুলো তৈরি করছে। এই পরিকল্পনায় স্থলবাহিনীর ব্যবহার এবং ব্যাপক বোমাবর্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হলে এবং বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তবে নাটকীয় সামরিক উত্তেজনার সম্ভাবনা আরও বাড়বে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, যুদ্ধ শেষ করতে এ ধরনের শক্তিশালী শক্তি প্রদর্শন শান্তি আলোচনায় বাড়তি সুবিধা দেবে অথবা ট্রাম্প একে বিজয় হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পাবেন।
তবে যুদ্ধের সমাপ্তি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে ইরানেরও নিজস্ব ভূমিকা থাকবে। আলোচনায় থাকা অনেকগুলো দৃশ্যপট যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করার পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও তীব্র করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস'-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তারা চারটি প্রধান 'চূড়ান্ত আঘাতের' বিকল্প বর্ণনা করেছেন, যেখান থেকে ট্রাম্প যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন:
- ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র 'খারগ দ্বীপ' আক্রমণ বা অবরোধ করা।
- হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করতে সহায়তা করা 'লারাক দ্বীপ' দখল করা। এই কৌশলগত দ্বীপে ইরানের বাঙ্কার, মালবাহী জাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম অ্যাটাক ক্রাফট এবং প্রণালির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের রাডার রয়েছে।
- কৌশলগত 'আবু মুসা' দ্বীপ এবং আরও দুটি ছোট দ্বীপ দখল করা। এগুলো প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথের কাছে অবস্থিত এবং ইরান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এগুলো নিজেদের বলে দাবি করে।
- হরমুজ প্রণালির পূর্ব দিকে ইরানি তেল রপ্তানি করা জাহাজগুলো আটকে দেওয়া বা জব্দ করা।
পারমাণবিক স্থাপনার ভেতরে সমাহিত উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সুরক্ষিত করতে ইরানের অভ্যন্তরে স্থল অভিযানের পরিকল্পনাও তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে এ ধরনের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ওই স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালাতে পারে, যাতে ইরান কখনোই সেই ইউরেনিয়াম ব্যবহারের সুযোগ না পায়।
ট্রাম্প এখনও এই দৃশ্যপটগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি এবং হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা যেকোনো সম্ভাব্য স্থল অভিযানকে 'কাল্পনিক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সূত্রগুলো বলছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা শীঘ্রই কোনো ইতিবাচক ফল না দিলে তিনি উত্তেজনা বাড়াতে প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত বুধবার ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, কোনো চুক্তি না হলে ট্রাম্প 'আগের চেয়েও কঠোর' আঘাত হানতে প্রস্তুত। লেভিট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট বানিয়ে বলেন না এবং তিনি নরক নামিয়ে আনতে প্রস্তুত। ইরানের উচিত হবে না পুনরায় ভুল হিসাব করা... এরপর থেকে যেকোনো সহিংসতার কারণ হবে ইরানি প্রশাসন... যারা চুক্তিতে আসতে অস্বীকার করছে।'
আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন এবং হাজার হাজার সৈন্যসহ আরও সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সপ্তাহের মধ্যে একটি মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট পৌঁছাবে এবং অন্য একটি মোতায়েন করা হচ্ছে। ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কমান্ড এলিমেন্টকে কয়েক হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি পদাতিক ব্রিগেডসহ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাবকে বিশ্বাস করেন না এবং একে আকস্মিক হামলার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত বুধবার এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন যে, ইরানি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী 'ইরানের শত্রুরা, অঞ্চলের একটি দেশের সহায়তায় ইরানের একটি দ্বীপ দখলের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।'
গালিবাফ সম্ভবত সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আবু মুসা দ্বীপের প্রতি তাদের দাবির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি আরও যোগ করেন, 'শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। তারা যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে ওই আঞ্চলিক দেশটির সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।'
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরুর চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে যে, পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্ক এখনও পক্ষগুলোর মধ্যে একটি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করছে। সূত্রটি জানায়, ইরান প্রাথমিক মার্কিন দাবির তালিকা প্রত্যাখ্যান করলেও তারা আলোচনা পুরোপুরি নাকচ করে দেয়নি। ওই সূত্র মতে, 'তবে অবিশ্বাসই এখন প্রধান সমস্যা। আইআরজিসি (ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী) কমান্ডাররা খুবই সন্দিহান। তবুও মধ্যস্থতাকারীরা হাল ছাড়েননি।'
