শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি: যুক্তরাষ্ট্রে আইনি লড়াইয়ে হারল মেটা ও গুগল
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি বুধবার রায় দিয়েছে যে মেটা ও গুগল তরুণদের জন্য ক্ষতিকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করার ক্ষেত্রে অবহেলা করেছে। ৬ মিলিয়ন ডলারের এই রায়টি একই ধরনের বহু মামলার জন্য একটি 'টেস্ট কেস' বা দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
জুরি মেটাকে চার দশমিক দুই মিলিয়ন ডলার এবং গুগলকে এক দশমিক আট মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর মধ্যে থাকা এই দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য এই অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, যাদের বার্ষিক মূলধনী ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
লস অ্যাঞ্জেলেসের এই বিচারটি ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতগুলোতে একত্রিত হওয়া হাজার হাজার অনুরুপ মামলার জন্য একটি 'টেস্ট কেস' বা পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
'জবাবদিহিতা সময় এসে গেছে'
এই মামলাটি ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে ঘিরে, যিনি মামলার শুরুতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং আদালতে 'ক্যালি' নামে পরিচিত। তিনি দাবি করেন, ছোটবেলা থেকেই গুগলের ইউটিউব এবং মেটার ইন্সটাগ্রাম-এ তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। এর কারণ হিসেবে তিনি প্ল্যাটফর্মগুলোর আকর্ষণীয় ডিজাইন, যেমন 'ইনফিনিট স্ক্রল' ফিচারের কথা উল্লেখ করেন, যা ব্যবহারকারীদের ক্রমাগত নতুন পোস্ট দেখতে উৎসাহিত করে।
জুরি দেখতে পেয়েছে যে, গুগল এবং মেটা উভয় অ্যাপের ডিজাইনেই অবহেলা করেছে এবং এর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী এক বিবৃতিতে বলেন, 'আজকের রায়টি একটি গণভোটের মতো—একটি জুরি থেকে পুরো শিল্পের প্রতি বার্তা যে, জবাবদিহিতার সময় এসে গেছে।'
মেটা ও গুগল এই রায়ের সঙ্গে একমত নয় এবং তারা আপিল করার পরিকল্পনা করছে বলে উভয় প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন।
রায়ের পর মেটার শেয়ার ০.৩ শতাংশ এবং গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেটের শেয়ার ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে থেমে গেছে।
মার্কিন আইন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মের বিষয়বস্তুর জন্য সুরক্ষা দিলেও, লস অ্যাঞ্জেলেসের এই মামলায় বিষয়বস্তুর চেয়ে প্ল্যাটফর্মের 'ডিজাইন' বা কাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ডি.এ. ডেভিডসনের প্রযুক্তি বিশ্লেষক গিল লুরিয়া বলেন, এই রায় মেটা ও গুগলের জন্য একটি 'ধাক্কা'। তিনি বলেন, 'এই প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যৎ মামলা ও আপিলের মাধ্যমে দীর্ঘায়িত হবে, তবে শেষ পর্যন্ত এটি কোম্পানিগুলোকে ভোক্তা সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে, যা তাদের প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা ধীর করতে পারে।'
এই মামলায় স্ন্যাপ ও টিকটককেও আসামি করা হয়েছিল। তবে বিচার শুরুর আগেই তারা বাদীর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই চুক্তির শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।
ক্রমবর্ধমান সমালোচনা
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে। এখন এই বিতর্ক আদালত ও অঙ্গরাজ্য সরকারের পর্যায়ে চলে গেছে। তবে মার্কিন কংগ্রেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো বিস্তৃত আইন পাস করতে পারেনি।
ন্যাশনাল কনফারেন্স অফ স্টেট লেজিসলেচারস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও শিশুদের বিষয়ে আইন পাস করেছে।
এই আইনের মধ্যে রয়েছে স্কুলে সেলফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে বয়স যাচাইকরণের বাধ্যবাধকতা। মেটা এবং গুগলের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সমর্থিত বাণিজ্যিক সংগঠন 'নেটচয়েস' আদালতে এই বয়স যাচাইকরণের প্রয়োজনীয়তা বাতিলের চেষ্টা করছে।
রায়ের পর রিপাবলিকান সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন এবং ডেমোক্র্যাট রিচার্ড ব্লুমেন্টাল এক বিবৃতিতে কংগ্রেসকে এমন আইন পাসের আহ্বান জানিয়েছেন যা সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে শিশুদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করতে বাধ্য করবে।
এছাড়া, ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে এই গ্রীষ্মে বেশ কয়েকটি রাজ্য এবং স্কুল ডিস্ট্রিক্টের আনা সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি সংক্রান্ত আরেকটি মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে জুলাই মাসে আরও একটি রাজ্য পর্যায়ের বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে যেখানে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক এবং স্ন্যাপচ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পৃথকভাবে, নিউ মেক্সিকোর একটি জুরি মঙ্গলবার মেটাকে রাজ্য আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল অভিযোগ করেছিলেন যে, কোম্পানিটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে এবং সেখানে শিশুদের যৌন শোষণের সুযোগ করে দিয়েছে।
বিচার চলাকালীন যুক্তি
বিচার চলাকালে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে মেটা ও গুগল ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্য করে কাজ করেছে এবং নিরাপত্তার চেয়ে লাভকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
অন্যদিকে, মেটার আইনজীবীরা দাবি করেন, বাদীর শৈশবের কঠিন পারিবারিক পরিবেশই তার মানসিক সমস্যার কারণ। ইউটিউবের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই তরুণীর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরিমাণ খুবই কম ছিল।
জুরিদের সামনে উপস্থাপিত অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, কীভাবে মেটা ও গুগল তরুণ ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। শুনানিতে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দেন।
এক পর্যায়ে, কিশোরীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করা সত্ত্বেও 'বিউটি ফিল্টার'-এর ওপর আরোপিত সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে জাকারবার্গ বলেন, তিনি ব্যবহারকারীদের নিজেদের প্রকাশের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন।
জাকারবার্গ বলেন, 'আমার মনে হয়েছে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার জন্য প্রমাণগুলো যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না।'
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ—এই বিষয়গুলো কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা আপিলের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
