কেবল জ্বালানি নয়, বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্য সংকটেরও কারণ হতে পারে ইরান যুদ্ধ
ইরানে চলমান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এ যুদ্ধ। মূলত কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য সারের চরম সংকটের কারণেই এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ২ মার্চ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারী ঘোষণা দেন, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালী বর্তমানে 'বন্ধ'। এই ঘোষণার পরপরই তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
কেন সারের সংকট তৈরি হচ্ছে?
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়ার মোট বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য সারের একটি বিশাল অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে রপ্তানি করা হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরণের প্রতিবন্ধকতা সরাসরি বৈশ্বিক কৃষিখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সার কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি তাদের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ইউরিয়া সার কারখানাটির উৎপাদনও বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত তাদের তিনটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন; দেশের পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বছরের এই সময়ের তুলনায় সারের মজুত প্রায় ২৫ শতাংশ কম।
সরবরাহ কমার পাশাপাশি সারের দামও নাটকীয়ভাবে বাড়ছে। জ্বালানি ও পণ্য বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা আর্গাস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়া রপ্তানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার দাম ৫০০ ডলারের নিচ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় সারের দাম এখন প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
বিশ্বজুড়ে সার উৎপাদনের কতটুকু অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে?
জাহাজ চলাচল পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপ-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সারের ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় উপসাগরীয় অঞ্চলে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ইউরিয়া সারের মোট সরবরাহের ৪৬ শতাংশই আসে এ অঞ্চল থেকে।
কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) বিশ্বের বৃহত্তম ইউরিয়া সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত। এটি একাই বিশ্বের ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে থাকে।
তথ্য ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী সার বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ ব্যাহত হতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কেবল ভারত, পাকিস্তান ও চীনের পতাকাবাহী হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে নিরাপদে এই জলপথ পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মর্নিংস্টার-এর বিশ্লেষক সেথ গোল্ডস্টাইনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, সারের দাম বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। বিশেষ করে নাইট্রোজেন সারের দাম প্রায় দুই গুণ বাড়ার পাশাপাশি ফসফেট সারের দামও প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোন দেশগুলো এ সারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সার রপ্তানির ওপর সবথেকে বেশি নির্ভরশীল। তথ্য ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর মতে, এই অঞ্চলের মোট ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ, সালফার রপ্তানির ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়া রপ্তানির ৬৪ শতাংশই আসে এশিয়ায়।
এই রপ্তানি বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল এবং চীনের মতো প্রধান কৃষি প্রধান দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সার রপ্তানি করা হয়।
ভারত তার প্রয়োজনীয় ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশেরও বেশি এই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে, ব্রাজিলের সারের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার অর্ধেকই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
কেন সারের অভাব খাদ্য উৎপাদনকে কঠিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?
সারের এই সংকট এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন উত্তর গোলার্ধে বীজ বপন বা বসন্তকালীন চাষাবাদের মৌসুম চলছে। সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত এই সময়কাল থাকে।
বাণিজ্যিক চাষাবাদে ভালো ফলনের জন্য প্রায় প্রতিটি ফসলের ক্ষেত্রেই সার অপরিহার্য। তবে বিভিন্ন ফসলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের এবং ভিন্ন মাত্রার সারের প্রয়োজন হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ সস্তা রুশ গ্যাসের সুবিধা হারায়। এর ফলে তারা সারের উৎপাদন ও সরবরাহ কমাতে বাধ্য হলে বিশ্বে ইউরিয়া সংকট তৈরি হয়, যার রেশ এখনো কাটেনি।
এর পাশাপাশি চীন তাদের নিজেদের কৃষকদের চাহিদা মেটাতে ইউরিয়াসহ বিভিন্ন সার রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব কী?
উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যারা সবচেয়ে বেশি সার আমদানি করে—যেমন ভারত, ব্রাজিল এবং চীন—তারা একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম।
ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কৃষি ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী দেশ, যারা প্রচুর পরিমাণে চাল, গম, ডাল এবং ফল উৎপাদন করে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে চাল রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে ভারত থেকে।
মার্কিন কৃষি দপ্তরের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের মোট সয়াবিন রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশই করে ব্রাজিল। এ ছাড়া দেশটি প্রচুর চিনি ও ভুট্টা রপ্তানি করে। অন্যদিকে, চীন বিশ্বজুড়ে চা পাতা সরবরাহের প্রধান উৎস। এ ছাড়া রসুন এবং মাশরুমের মতো কৃষিপণ্যের বড় অংশই তারা সরবরাহ করে।
তাই সারের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং চড়া দামের কারণে অনেক কৃষক যদি সার ব্যবহার কমিয়ে দেন বা বন্ধ করে দেন, তবে ফসলের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। চাল, গম, ভুট্টা এবং সয়াবিনের মতো মৌলিক ফসলের উৎপাদন কমে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে এবং বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে ভয়াবহ খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
