ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খোঁজার পরামর্শ উপদেষ্টাদের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চাইছেন, কারণ তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব তৈরির আশঙ্কায় তার উপদেষ্টারা গোপনে যুদ্ধের ইতি টানার পরিকল্পনা বা 'এক্সিট প্ল্যান' খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন।
সোমবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্যগুলোর বড়ভাগই অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছি।' তিনি আরও যোগ করেন, এই যুদ্ধ 'খুব শিগগিরই' শেষ হবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এই অভিযান শেষ করার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা তিনি জানাননি। ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সাধারণ মানুষকে সহায়তা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্পকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেয়ে বরং দ্রুত যুদ্ধের ইতি টানার পক্ষেই বেশি আগ্রহী মনে হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, 'আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বয়ে আনবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে আমাদের এখনই এর শেষ করা উচিত।' নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় ট্রাম্প হতাশা প্রকাশ করেন। মোজতবার এই অভিষেক মূলত তেহরানের নতি স্বীকার না করার বার্তাই দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যতক্ষণ তেহরান এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা চালাবে এবং ইসরায়েল ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে চাইবে, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই যুদ্ধ থেকে সহজে সরে আসা কঠিন হবে। সোমবারের বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ রাখে, তবে তিনি দেশটিতে হামলা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যতক্ষণ ট্রাম্প একটি সন্তোষজনক বিজয় দাবি করতে না পারছেন, ততক্ষণ তিনি লড়াই থামাবেন না—বিশেষ করে যখন সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর যৌথ অভিযানের মুখেও তেহরান কেন নতি স্বীকার করছে না, তা দেখে ট্রাম্প কখনো কখনো বিস্মিত হয়েছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এসব খবরকে ভুয়া দাবি করে বলেছেন, 'বেনামী সূত্রের বরাত দিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ আজেবাজে কথায় ভরা। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, ওইসব সূত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশেপাশে নেই।' তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সহযোগীরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নজর রাখছেন যাতে 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র অভাবনীয় সাফল্য বজায় থাকে। এই অভিযানের সমাপ্তি কখন হবে, তা চূড়ান্তভাবে কেবল কমান্ডার-ইন-চিফই (ট্রাম্প) নির্ধারণ করবেন।
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্যও পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে তিনি ইরানের 'নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ' দাবি করেছিলেন এবং দেশটিতে স্থল সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। তবে সোমবার তিনি নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেন, এমন কোনো নির্দেশ দেওয়ার 'ধারেকাছেও' তিনি নেই।
সোমবার যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির কথা বললেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরে যোগ করেন, 'আমরা আরও অগ্রসর হতে পারি এবং আমরা আরও সামনে এগিয়ে যাব।' বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তার সহযোগীদের বলেছেন, যদি খামেনি-পুত্র মার্কিন দাবি মানতে রাজি না হন, তবে তাকে হত্যার বিষয়টিও তিনি সমর্থন করবেন।
তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়া এবং পরে আবার কমে যাওয়ার মধ্যেই ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো এল। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় এবং এর রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ট্রাম্পের মিত্রদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা উদ্বেগ এখন আরও বেড়েছে।
এই বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের কিছু উপদেষ্টা তাকে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। তারা চাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট যেন এখন দাবি করেন যে সামরিক অভিযানের লক্ষ্যগুলো বড়ভাগই অর্জিত হয়েছে। প্রেসিডেন্টের রক্ষণশীল সমর্থকদের অনেকেই এখন পর্যন্ত এই অভিযানের পক্ষে থাকলেও, তার কিছু উপদেষ্টা গোপনে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সমর্থন কমে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে জনমত জরিপের কিছু তথ্য ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু জনমত জরিপে দেখা গেছে যে বেশিরভাগ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, 'আমেরিকার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইরানি শাসকগোষ্ঠীর হুমকির অবসান এবং সন্ত্রাসীদের হত্যা করা সমর্থন করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটিই অর্জন করতে যাচ্ছেন।'
তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের কিছু উপদেষ্টা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত কিছু রিপাবলিকান নেতার কাছ থেকেও তারা নিয়মিত ফোন পাচ্ছেন। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মুর বলেন, 'গ্যাস ও তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দামই বেড়ে যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় যেখানে আগে থেকেই একটি সমস্যা ছিল, সেখানে তেলের দাম বৃদ্ধি নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।'
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান তেলের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ সামাল দিতে ট্রাম্পের দল গত কয়েক দিনে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে তাদের আরও জোরালো প্রচারণামূলক কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
সোমবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেলের দাম কমাতে কিছু দেশের ওপর থেকে 'তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা' তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কোন কোন দেশের ওপর থেকে এই বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হবে, তাদের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি আরও জানান, এই অঞ্চলে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র 'ঝুঁকি বিমা'র ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজন পড়লে মার্কিন নৌবাহিনী ও তার মিত্ররা হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকারগুলোকে পাহারা (এসকর্ট) দিয়ে নিয়ে যাবে।
ইরানের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জন নিহতের ঘটনা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে তিনি 'যথেষ্ট জানেন না'। শুরুতে এই হামলার জন্য তেহরানকে দায়ী করলেও সোমবার তিনি বলেন, 'আমি যতটুকু জানি বিষয়টি এখন তদন্তাধীন আছে।' এই হামলার জন্য কারা দায়ী, তা নিয়ে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি 'রাজি' বলেও জানান।
এর আগে 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী ওই হামলার জন্য সম্ভবত আমেরিকান বাহিনীই দায়ী।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, সরকারি ভবন ও সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রসহ ইরানের হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কাজ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার মাধ্যমে দেশটিকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য আর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে না পারে।
এর বিপরীতে তেহরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চল থেকে এ পর্যন্ত ৩৬ হাজারেরও বেশি আমেরিকান নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেছেন বলে সোমবার জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।
