'ভয়ংকর এক মানুষ': ইরান যুদ্ধে মানুষ হত্যায় মেতেছেন পিট হেগসেথ, বাড়ছে উদ্বেগ
তার কথা শুনলে মনে হয় না তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক, বরং মনে হয় কার্টুনের কোনো খলনায়ক। লাল, সাদা ও নীল রঙের টাই পরে পেন্টাগনে সাংবাদিকদের সামনে বড়াই করে পিট হেগসেথ বলেছিলেন, 'সারাদিন ধরে আকাশ থেকে মৃত্যু আর ধ্বংস নেমে আসছে। এটিকে কখনোই কোনো ন্যায্য লড়াই হিসেবে ভাবা হয়নি, আর এটি কোনো ন্যায্য লড়াই নয়ও। শত্রুরা যখন দুর্বল হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, আমরা ঠিক তখনই আঘাত হানছি, আর লড়াইটা ঠিক এমনই হওয়া উচিত।'
৪৫ বছর বয়সী হেগসেথ একসময় ফক্স নিউজের উপস্থাপক ছিলেন। এখন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রধান। চলতি সপ্তাহে তিনিই হয়ে উঠেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের প্রধান মুখ।
আর এতেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সমালোচকদের কপালে। তারা সতর্ক করে বলছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী (যাকে এখন 'যুদ্ধমন্ত্রী' বলা হচ্ছে) খুব দ্রুতই পেন্টাগনকে একটি মতাদর্শগত ও ধর্মীয় ক্রুসেডের মঞ্চে পরিণত করছেন।
সমালোচকদের মতে, হেগসেথের এই পুরুষতান্ত্রিক আস্ফালন, উগ্র খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ এবং মার্কিন সেনাদের জীবনের প্রতি উদাসীনতা—সবই আসলে ট্রাম্পের মন জুগিয়ে চলার কৌশল। ট্রাম্প এমন একজন যুদ্ধবাজ নেতা চাইতেন, যে তার মনের মতো হবে।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সেখানে 'ব্রেভহার্ট', 'গ্ল্যাডিয়েটর', 'সুপারম্যান' ও 'টপ গান'-এর মতো হলিউড সিনেমার ক্লিপের সঙ্গে ইরানে হামলার বাস্তব দৃশ্য ও হেগসেথের ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
অলাভজনক সংগঠন 'ভেট ভয়েস ফাউন্ডেশন'-এর প্রধান নির্বাহী জ্যানেসা গোল্ডবেক বলেন, 'পিট হেগসেথ একজন ভয়ংকর মানুষ। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অস্ত্রভাণ্ডার এখন তার হাতের মুঠোয়।
আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে যার বিরুদ্ধে খুশি, যেখানে খুশি হত্যাযজ্ঞ চালানোর অনুমতি দিয়ে রেখেছেন।'
ফক্স নিউজ থেকে পেন্টাগন
অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে হেগসেথের এমন উত্থান চিন্তাও করা যেত না। মিনিয়াপোলিসে জন্ম নেওয়া হেগসেথ প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি রক্ষণশীল ছাত্র পত্রিকা 'প্রিন্সটন টোরি'র সম্পাদক ছিলেন, যেখানে তিনি নারীবাদ ও সমকামিতার মতো বিষয়গুলোর তীব্র সমালোচনা করতেন।
প্রিন্সটন ছাড়ার পর তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর ন্যাশনাল গার্ডে পদাতিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। কিউবার গুয়ানতানামো বে থেকে শুরু করে ইরাক ও আফগানিস্তানেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরে এক বইয়ে তিনি স্বীকার করেন, ইরাকে তার অধীনে থাকা সেনাদের তিনি আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে শত্রুদের হত্যা করার নির্দেশ দিতেন।
২০১৬ সালে 'কনসার্নড ভেটেরান্স ফর আমেরিকা' নামের এক রক্ষণশীল গ্রুপ থেকে তাকে আর্থিক অনিয়ম ও যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে তার নিজের মা পেনেলোপ তাকে এক ইমেইলে লিখেছিলেন: 'তুমি নারীদের ওপর নির্যাতন করো—এটাই কুৎসিত সত্য।
যে পুরুষ মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে এবং নিজের ক্ষমতা ও অহংকারের জন্য নারীদের ব্যবহার করে, আমি তাকে সম্মান করি না। তুমি সেই মানুষ... একজন মা হিসেবে এটা বলা আমার জন্য কষ্টদায়ক ও লজ্জার, কিন্তু এটাই সত্য।'
এরপর ফক্স নিউজের 'ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস' অনুষ্ঠানে নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন হেগসেথ। সেখানে তিনি প্রায়ই ট্রাম্পের সাক্ষাৎকার নিতেন এবং তার নীতির পক্ষে সাফাই গাইতেন।
একবার তিনি লিখেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জিতলে 'সেনাবাহিনী ও পুলিশকে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা হবে' এবং 'হ্যাঁ, কোনো না কোনোভাবে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে'।
সেনেটে বিতর্ক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব
২০২৪ সালে ট্রাম্প জেতার পর তাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দেন। সেনেটের শুনানিতে তার অতীত নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। সেনাবাহিনীতে নারীদের নিয়ে তার অবমাননাকর মন্তব্য, ডিউটির সময় মদ্যপান, যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং এমন বড় একটি পদের জন্য অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে সমালোচনা হয়।
শেষমেশ সেনেটে ভোট ৫০-৫০ হলে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের টাই-ব্রেকিং ভোটে তিনি পার পান।
দায়িত্ব নেওয়ার পরই হেগসেথ শত্রুদের ওপর 'ভয়াবহ ও শাস্তিমূলক সহিংসতা' চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি যুদ্ধকালীন নিয়মকানুন—যা সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি—সেগুলোকে 'বোকামি' বলে আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের কথা বলেন।
দায়িত্বের প্রথম সপ্তাহেই মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন ও জটিল সংঘাতের মধ্যে পড়ে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গাম্ভীর্য ভুলে গেছেন। বরং একজন দলীয় সম্প্রচারকের মতো তিনি আমেরিকার সহিংসতা চালানোর ক্ষমতা নিয়ে উল্লাস করছেন।
'দরজায় খাবার দেওয়ার যোগ্য নন'
সাবেক মেরিন কর্পস কর্মকর্তা জ্যানেসা গোল্ডবেক বলেন, 'হেগসেথ পেন্টাগন চালাতে কতটা অক্ষম ও হতাশাজনক তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তার আত্ম-অহংকার কেবল তার নৈতিক অবক্ষয়ের সঙ্গেই তুলনীয়।'
তিনি আরও বলেন, 'ভুললে চলবে না যে সে একসময় ফক্স নিউজের মর্নিং শো-এর উপস্থাপক ছিল। সে কার্টুন চরিত্রের মতো কথা বলে। সে ভাবে তার কথাগুলো খুব 'টাফ-গাই' বা শক্ত মানুষের মতো শোনাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো অভিজ্ঞদের কাছে তাকে মনে হয় একজন সম্পূর্ণ অযোগ্য মানুষ, যে জোর করে নিজেকে পুরুষালি প্রমাণের ভান করছে। সত্যি বলতে, এটা লজ্জাজনক। এই অযোগ্য লোকটার ওপর আমি একটা ফুড ডেলিভারি অর্ডারের দায়িত্ব দিতেও ভরসা পাব না।'
সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারাও একই উদ্বেগ জানিয়েছেন। ওবামা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, 'এই মুহূর্তে পেন্টাগন থেকে আমেরিকা এবং মিত্রদের যে ধরনের আশ্বাস ও কৌশল শোনা প্রয়োজন, হেগসেথের কাছে তা নেই।'
তিনি বলেন, 'মানুষের এখন তার এই বাগাড়ম্বর বা দম্ভোক্তির দরকার নেই। তাদের জানা দরকার যে আমেরিকার সেনাবাহিনী নিরাপদ হাতে আছে।
কিন্তু তার প্রথম কয়েকটি প্রেস কনফারেন্স দেখে মনে হচ্ছে, সে এখনও ফক্স নিউজের উপস্থাপকের চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধকালীন সেনাপ্রধানের ভূমিকা নিতে পারেনি।'
'তারা ধ্বংস হয়ে গেছে'
গত বুধবার পেন্টাগনে এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ দাম্ভিক সুরে ইরানি নেতাদের সম্পর্কে বলেন, 'তারা শেষ এবং তারা সেটা জানে। আমেরিকা চূড়ান্তভাবে, ধ্বংসাত্মকভাবে এবং কোনো দয়া মায়া ছাড়াই জিতছে।'
কুয়েতে ইরানি হামলায় নিহত ছয় মার্কিন সেনার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্টো সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, 'যখন কয়েকটা ড্রোন ঢুকে পড়ে বা দুঃখজনক কিছু ঘটে, তখন সেটা প্রথম পাতার খবর হয়। আমি বুঝি। সাংবাদিকরা শুধু প্রেসিডেন্টকে খারাপ দেখাতে চায়। কিন্তু একবার অন্তত সত্যটা জানান। এই যুদ্ধের প্রতিটি শর্ত আমরাই নির্ধারণ করব।'
তার এই মন্তব্যে নিহতদের প্রতি কোনো সহানুভূতি না থাকায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
নিউ স্কুলের ইতিহাসের অধ্যাপক জেরেমি ভ্যারন বলেন, 'এটা ভয়ংকর। মৃতদের সম্মান জানাতে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ, আর তিনি এটাকে শুধু ট্রাম্পকে নিচে নামানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।'
খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ ও 'ক্রুসেড'
সেনেটের শুনানিতে হেগসেথের চরিত্রের আরেকটি দিক প্রায় আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল—তা হলো খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদের প্রতি তার সহানুভূতি। ছবিতে দেখা গেছে তার শরীরে ক্রুসেডার বা ধর্মযোদ্ধাদের দুটি ট্যাটু আঁকা।
বুকে আছে 'জেরুজালেম ক্রস', যা মধ্যযুগীয় ধর্মযোদ্ধাদের প্রতীক। এর পাশেই একটি তলোয়ারের সঙ্গে লেখা আছে ল্যাটিন শব্দ 'Deus vult' বা 'ঈশ্বরের ইচ্ছা'।
এই স্লোগানটি ঐতিহাসিকভাবে ক্রুসেডের সঙ্গে যুক্ত এবং সম্প্রতি কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এটি ব্যবহার করছে। ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকের পোশাকেও এটি দেখা গিয়েছিল।
এগুলো শুধু প্রতীকী নয়। ২০২০ সালে লেখা 'আমেরিকান ক্রুসেড' বইয়ে হেগসেথ লিখেছিলেন, যারা 'পাশ্চাত্য সভ্যতা'র সুবিধা ভোগ করে, তাদের উচিত 'একজন ক্রুসেডারকে ধন্যবাদ জানানো'।
তিনি মনে করেন শুধু গণতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়ে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তিনি লিখেছেন, 'ভোট একটি অস্ত্র, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। আমরা যুদ্ধ করতে চাই না, কিন্তু ১ হাজার বছর আগের আমাদের সহ-খ্রিস্টানদের মতো আমাদের যুদ্ধ করতেই হবে।'
এর চেয়েও ভয়ংকর কিছু অভিযোগ রয়েছে। 'দ্য নিউ ইয়র্কার' জানিয়েছে, একবার কাজের সূত্রে ভ্রমণের সময় এক বারে মাতাল অবস্থায় হেগসেথ ও তার এক সঙ্গী বারবার চিৎকার করে বলছিলেন, 'সব মুসলিমকে হত্যা করো!'
পবিত্র যুদ্ধের উসকানি
হেগসেথ এর আগে চরমপন্থী খ্রিস্টান বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলেছেন। এই দর্শনে সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড এবং সমাজে কট্টর পিতৃতন্ত্রের কথা বলা হয়।
ওয়াশিংটনের পাবলিক রিলিজিয়ন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট রবার্ট পি জোন্স বলেন, 'এটা কোনো একটি বা দুটি মন্তব্যের বিষয় নয়। এটি হেগসেথের দীর্ঘদিনের মানসিকতা। এটি শুধু সহিংসতার প্রশস্তি নয়, বরং খ্রিস্টধর্ম ও সভ্যতার নামে সহিংসতার গুণগান।'
মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) জানিয়েছে, সামরিক কমান্ডাররা ইরান যুদ্ধে জড়ানোর জন্য 'শেষ জমানা' বিষয়ক চরমপন্থী খ্রিস্টান বয়ান ব্যবহার করছেন বলে তাদের কাছে ২০০টিরও বেশি অভিযোগ এসেছে। এ ধরনের ভাষা আরব মিত্রদের ক্ষুব্ধ করতে পারে এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরানের 'পবিত্র যুদ্ধ'কে আরও উসকে দিতে পারে।
জোন্স সতর্ক করে বলেন, 'তারা বিষয়টিকে পরমাণু কর্মসূচি বা সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বৈধ রাজনৈতিক কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে না। তারা একে রাজনীতির গণ্ডি থেকে বের করে একটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে একটি তথাকথিত খ্রিস্টান দেশের পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরছে।'
প্রগতিশীল খ্রিস্টান গ্রুপের যাজক ডগ প্যাজিট হেগসেথের মানসিকতাকে কনস্ট্যান্টাইনের ঐতিহাসিক কুসংস্কারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি ঈশ্বরের নামে জয় করতে ঢালে ক্রুশ এঁকেছিলেন।
ক্রুসেডের বিভীষিকার পর খ্রিস্টান চার্চ শত শত বছর ধরে এই তত্ত্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
প্যাজিট বলেন, 'আমার মনে হয় পিট হেগসেথ ভাবেন যে এই সরকারের ওপর কোনো ঐশ্বরিক দায়িত্ব আছে। তার ধারণা, ঈশ্বর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্বের বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বেছে নিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'হেগসেথের খ্রিস্টধর্মের ধারণা হলো অন্য দেশের সরকারের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার ঘটানো।
তিনি বিশ্বাস করেন, সেনাবাহিনী শুধু তার উদ্দেশ্যেই নয়, বরং বিশ্বে ঈশ্বরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে।'
