চাঁদের অনুরূপ কৃত্রিম মাটিতে সফলভাবে ছোলা গাছের জন্ম ও ফলন হয়েছে: গবেষণা
চাঁদের বুকে ফসল ফলানোর স্বপ্ন আরও একধাপ সত্যি হতে চলেছে। নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে, বিজ্ঞানীরা চাঁদের মাটির হুবহু নকল বা কৃত্রিম মাটিতে সফলভাবে ছোলা চাষ করেছেন এবং ফসলও তুলেছেন।
'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, চাঁদের মাটির অনুরূপ 'রেগোলিথ'-এর সঙ্গে এক বিশেষ ধরনের মিথোজীবী ছত্রাক ও কেঁচোর তৈরি কম্পোস্ট সার মিশিয়ে বিজ্ঞানীরা এই অসাধ্য সাধন করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ছত্রাক এবং সারের এই মিশ্রণ ছোলা গাছের প্রজনন বা ফলনের সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির মৃত্তিকা ও শস্য বিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি গবেষক জেস অ্যাটকিন এবিসি নিউজকে বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে চাঁদের মাটি নিজে থেকে উদ্ভিদের সুস্থ বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে না।
এর অন্যতম কারণ হলো, এতে অ্যালুমিনিয়াম ও জিংকের মতো ধাতুর পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়া পৃথিবীর মাটির মতো এতে কোনো অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম নেই। এর পাউডারের মতো গঠনের কারণে পানিও সহজে এর ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে না।
অ্যাটকিন বলেন, 'চাষযোগ্য মাটির জন্য দুটি জিনিস অপরিহার্য: জৈব পদার্থ এবং অণুজীব। আর চাঁদের মাটিতে এর কোনোটিই নেই।'
তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর উদ্ভিদের কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। পৃথিবীর ৮০ শতাংশেরও বেশি উদ্ভিদ 'আরবাসকুলার মাইকোরাইজা' নামক এক ধরনের ছত্রাকের সঙ্গে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকে।
অ্যাটকিন একে 'পৃথিবীর প্রাচীনতম মিথোজীবী সম্পর্কগুলোর একটি' বলে উল্লেখ করে জানান, 'মূলত এই ছত্রাকটিই উদ্ভিদকে স্থলে টিকে থাকতে এবং শিকড় গজাতে সাহায্য করেছিল।'
মহাকাশে ফসল উৎপাদনের গবেষণায় সাধারণত ছোলা খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। তবে অ্যাটকিন একে বেছে নিয়েছেন কারণ এটি চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং এতে প্রচুর প্রোটিন রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় অণুজীবকে সংকেত পাঠিয়ে কাছে টেনে নিতে পারে। অ্যাটকিন বলেন, 'সাধারণত লেটুস, টমেটো বা অন্যান্য শাকসবজি নিয়ে গবেষণা করা হয়, যেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্থোসায়ানিন থাকে এবং যা বিকিরণ বা রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করতে পারে।'
অ্যাটকিন জানান, কৃত্রিম চাঁদের মাটির পরিমাণ যেখানে বেশি ছিল, সেখানে ছোলার ফলন এবং বীজের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তবে উৎপাদিত বীজগুলো প্রায় একই আকারের ছিল, অর্থাৎ এর গুণগত মানে কোনো প্রভাব পড়েনি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে এই বীজগুলোর পুষ্টিগুণ, প্রোটিনের মাত্রা এবং এগুলোতে কোনো ক্ষতিকর ধাতু জমেছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
ছত্রাক ছাড়াও বিজ্ঞানীরা মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করতে 'ভার্মিকম্পোস্ট' বা কেঁচোর সার ব্যবহার করেছেন। অ্যাটকিন বলেন, এটি বেছে নেওয়ার একটি বিশেষ কারণ আছে।
নাসার একটি প্রকল্প রয়েছে যেখানে কফির উচ্ছিষ্ট, বেঁচে যাওয়া খাবার এবং এমনকি পুরোনো সুতির টি-শার্টের মতো বাতিল জিনিসপত্র কেঁচোকে খেতে দেওয়া হয়। এর ফলে কেঁচো যে বর্জ্য ত্যাগ করে, তা আসলে 'দারুণ পুষ্টিকর' এক ধরনের সার।
গবেষণায় ব্যবহৃত কৃত্রিম চাঁদের মাটি ফ্লোরিডার একটি ল্যাব থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান অ্যাটকিন। এই মাটি চাঁদের সেই অবতরণস্থলের মাটির হুবহু নকল করে বানানো হয়েছে, যেখানে আসন্ন 'আর্টেমিস ৪' মিশনে মহাকাশচারীরা নামবেন। ২০২৮ সালের দিকে এই মিশনটি পরিচালনার কথা রয়েছে।
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো ১৭-এর পর এটিই হবে চাঁদে নাসার প্রথম মানব মিশন। অ্যাটকিন বলেন, 'গঠনগত দিক থেকে এই কৃত্রিম মাটি ৯৯ শতাংশ নিখুঁত।'
এই গবেষণার ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, কৃত্রিম চাঁদের মাটিতেও উদ্ভিদ জন্মাতে পারে এবং ছত্রাক বেঁচে থেকে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো এই চাষাবাদ প্রক্রিয়া কতটা টেকসই তা নির্ধারণ করা।
অ্যাটকিন বলেন, 'আমরা আরও কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে ফসল ফলানোর চেষ্টা করব এবং দেখব এটিকে কতটা একটি জীবন্ত ও কার্যকর চাঁদের মাটিতে রূপ দেওয়া যায়।'
এই গবেষণা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় পথ খুলে দিল। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে মানুষ যখন সত্যিই চাঁদে বসবাস শুরু করবে, তখন সেখানে নানা ধরনের ফসল ফলানো সম্ভব হবে।
