চাঁদে আলোর ঝলকানি, আকাশে ভাসমান বস্তু: কী আছে পেন্টাগনের প্রকাশ করা নতুন ইউএফও নথিতে?
আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট (ইউএফও) বা অজানা উড়ন্ত বস্তু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন প্রথমবারের মতো বেশ কিছু গোপন নথি প্রকাশ করেছে। কয়েক দশকের পুরোনো এসব নথিতে পৃথিবীতে সাধারণ মানুষ এবং চাঁদে নভোচারীদের দেখা নানা রহস্যময় বস্তুর বর্ণনা রয়েছে।
গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এসব নথি অনলাইনে ছাড়া হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউএফও নিয়ে মানুষের 'বিপুল আগ্রহের' কারণেই তিনি এগুলো প্রকাশ করবেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিনগ্রহের প্রাণী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের আগ্রহ নতুন করে বেড়েছে। ২০২২ সালে দীর্ঘ ৫০ বছর পর ইউএফও নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে শুনানি হয় এবং সামরিক বাহিনীও এ বিষয়ে আরও স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের ওয়েবসাইটে ইতিমধ্যে ১৬১টি ফাইল আপলোড করা হয়েছে এবং আরও ফাইল প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'ভিনগ্রহের প্রাণীরা সত্যিই আছে, কিন্তু আমি তাদের দেখিনি।' তার এই মন্তব্যের পর এ নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তবে ওবামা পরে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে মহাবিশ্বে অন্য প্রাণীর অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল, কিন্তু প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি এর কোনো প্রমাণ দেখেননি।
ওবামার ওই মন্তব্যের পর ট্রাম্প পেন্টাগনকে ভিনগ্রহের প্রাণী এবং ইউএফও সম্পর্কিত গোপন নথি প্রকাশের নির্দেশ দেন।
শুক্রবার প্রকাশ হওয়া ফাইলগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়েক দশকের পুরোনো সামরিক মেমো, অ্যাপোলো চন্দ্রাভিযানের রিপোর্ট এবং সাধারণ মানুষের চোখে দেখা নানা রহস্যময় উড়ন্ত বস্তুর বিবরণ, যা ভিনগ্রহের প্রাণীদের যান হতে পারে বলে অনেকের সন্দেহ।
নভোচারীদের বর্ণনায় 'আলোর ঝলকানি'
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে চাঁদে যাওয়া অ্যাপোলো ১১, অ্যাপোলো ১২ এবং অ্যাপোলো ১৭ মিশনের নভোচারীদের বেশ কিছু গোপন ট্রান্সক্রিপ্ট এই ফাইলগুলোতে রয়েছে।
অ্যাপোলো ১১ মিশনের বিখ্যাত নভোচারী বাজ অলড্রিন ১৯৬৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি চাঁদে ভ্রমণের সময় বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনা দেখেছেন। তিনি বলেন, 'আমি একটি বেশ উজ্জ্বল আলোর উৎস দেখেছি, যা আমরা প্রাথমিকভাবে কোনো লেজার রশ্মি হতে পারে বলে ভেবেছিলাম।' শুক্রবার এই সাক্ষাৎকারটিও প্রকাশ করা হয়েছে।
অ্যাপোলো ১২-এর নভোচারী অ্যালান বিন ১৯৬৯ সালে চাঁদে হেঁটেছিলেন। প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্টে দেখা যায়, তিনি মিশন চলাকালে কিছু কণা এবং আলোর ঝলকানি 'মহাকাশে ভেসে যেতে' দেখেছেন। তার মনে হয়েছিল, কণাগুলো যেন 'চাঁদ থেকে পালাচ্ছে'।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের দুজন নভোচারীও মহাকাশযানে বসে আলোর ঝলকানি দেখার কথা জানিয়েছিলেন। নভোচারী জ্যাক স্মিট বলেছিলেন, 'বাইরে যেন ফোরথ অব জুলাইয়ের (যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস) উদযাপন হচ্ছে!' তবে তারা এ-ও বলেছিলেন যে এই আলো হয়তো বরফের টুকরোর ওপর পড়া প্রতিফলন হতে পারে।
প্রকাশিত আরেকটি ফাইলে ১৯৬৫ সালের জেমিনাই ৭ স্পেসফ্লাইটের একটি অডিও রেকর্ডিং রয়েছে। সেখানে নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান এবং গ্রাউন্ড সাপোর্টের মধ্যে কথোপকথন শোনা যায়। বোরম্যান নাসার মিশন কন্ট্রোলকে একটি অজ্ঞাত বস্তু দেখার কথা জানান। তিনি মহাকাশযানের বাঁ দিকে একটি 'রহস্যময় বস্তু' এবং 'কোটি কোটি ছোট ছোট কণা' দেখার কথা বর্ণনা করেছিলেন।
আলো ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ভাসমান বস্তু
কয়েক দশকের পুরোনো এই ফাইলগুলোতে সাধারণ মানুষের চোখে দেখা ইউএপি (আনআইডেন্টিফায়েড অ্যানোমালাস ফেনোমেনা) বা রহস্যময় ঘটনার বহু বিবরণ রয়েছে।
একটি ফাইলে দেখা যায়, ১৯৫৭ সালে এফবিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক ব্যক্তি মাটি থেকে একটি বড়, গোলাকার যান ওপরে উঠতে দেখার কথা জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কিছু সাক্ষাৎকারে মার্কিন নাগরিকরা জানিয়েছেন, তারা তীব্র উজ্জ্বল আলোর ভেতর থেকে ধাতব বস্তু বেরিয়ে এসে আকাশে ভাসতে দেখেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বাহিনীর চোখে ইউএফও
এই ফাইলগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ধারণ করা কিছু ভিডিও ক্লিপও রয়েছে, যেগুলো ২০২২ সালের। ইরাক, সিরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ধারণ করা এই ভিডিওগুলোকে পেন্টাগন 'সমাধান না হওয়া রহস্যময় ঘটনা' বলে উল্লেখ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অজ্ঞাত এক স্থান থেকে ২০২২ সালে ধারণ করা একটি ক্লিপে ডিম্বাকৃতির একটি বস্তুকে বাঁ থেকে ডান দিকে দ্রুতগতিতে ছুটে যেতে দেখা যায়। রিপোর্টে একে 'সম্ভাব্য মিসাইল' বলা হয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
টেনেসি অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টিম বারচেট দীর্ঘদিন ধরেই ইউএফও নিয়ে সরকারের স্বচ্ছতার দাবি করে আসছিলেন। পেন্টাগনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্সে তিনি একে একটি 'দারুণ শুরু' বলে উল্লেখ করেন।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান অ্যানা পলিনা লুনাও এক বিবৃতিতে একে 'সঠিক দিকে প্রথম পদক্ষেপ' বলে প্রশংসা করেছেন।
তবে সাবেক কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছেন। একসময় ট্রাম্পের মিত্র এই রাজনীতিবিদ বলেন, আমেরিকানদের জন্য জিনিসপত্রের দাম ও ইরান যুদ্ধের মতো জরুরি বিষয়গুলো থেকে মনোযোগ সরাতেই ইউএফও-এর এই ফাইল প্রকাশ করা হয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে লেখেন, '"এই ঝকঝকে বস্তুটি দেখুন" ধরনের প্রোপাগান্ডায় আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত।'
