৫০ বছরেও কেন মানুষ আর চাঁদে গেল না?
১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর। অ্যাপোলো ১৭-এর কমান্ডার জিন সারনান চাঁদের মাটি ছাড়ার আগে বলেছিলেন, 'আমরা যেমন এসেছি, তেমনই চলে যাচ্ছি। সৃষ্টিকর্তা চাইলে আমরা ফিরে আসব—সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি ও আশা নিয়ে।'
সারনান জানতেন, তার পায়ের ছাপই হবে চাঁদের বুকে মানুষের শেষ স্মৃতিচিহ্ন। কারণ পরবর্তী অ্যাপোলো মিশনগুলো (১৮, ১৯ ও ২০) আগেই বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি হয়তো ভাবতেও পারেননি যে, ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও তার সেই কথাগুলোই হবে চাঁদে উচ্চারিত মানুষের শেষ শব্দ।
নাসা এখন 'আর্টেমিস ২' মিশন নিয়ে প্রস্তুত। আগামী মার্চেই এই মহাকাশযান উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। এটি চাঁদে নামবে না, বরং পাশ দিয়ে উড়ে যাবে বা 'ফ্লাই-বাই' করবে। তবুও অ্যাপোলো ১৭-এর পর এটিই হবে চাঁদের কাছাকাছি মানুষের প্রথম যাত্রা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, চাঁদে ফিরতে এত দেরি হলো কেন?
স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের কিউরেটর টিজেল মুইর-হারমনি বলেন, 'সহজ উত্তর হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। চাঁদে মানুষ পাঠাতে প্রচুর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি লাগে। এটি অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগের বিষয়। দিনের পর দিন এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।'
অ্যাপোলোর পর অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রাধিকারও বদলে গেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। নাসার সাবেক প্রধান প্রযুক্তিবিদ লেস জনসনও একমত। তিনি বলেন, 'প্রতি চার থেকে আট বছরে নাসার লক্ষ্য আমূল বদলে যায়।'
তিনি বলেন, '১৯৯০ সালে জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ আমাদের চাঁদে ফিরতে বলেছিলেন। ১৯৯৩ সালে ক্লিনটন এসে তা বাতিল করে মহাকাশ স্টেশন বা স্পেস স্টেশনের দিকে জোর দেন। ২০০১ সালে জর্জ ডব্লিউ. বুশ এসে আবার চাঁদের দিকে মনোযোগ দিতে বলেন। তখন কনস্টেলেশন প্রজেক্ট শুরু হয়। এরপর ওবামা এসে উল্কাপিণ্ড গবেষণায় জোর দেন এবং ট্রাম্প আবার চাঁদে ফেরার লক্ষ্য ঠিক করেন।'
২০২০ সালের পর জো বাইডেন এই চক্র ভাঙেন। তিনি ট্রাম্পের অনেক নীতি পছন্দ না করলেও চাঁদে ফেরার বিষয়টি সমর্থন করেন। এখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনকে টেক্কা দিতে চাঁদে মানুষ পাঠানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
রাজনীতি ছাড়াও কারিগরি চ্যালেঞ্জও কম নয়। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার। অর্ধেকের বেশি চন্দ্রাভিযান ব্যর্থ হয়েছে। নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম দুই দশক ধরে ৫ হাজার কোটি ডলার খরচে তৈরি রকেট ও মহাকাশযান নিয়ে এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
কেন অ্যাপোলোর পুনরাবৃত্তি করা গেল না?
অনেকে প্রশ্ন করেন, অ্যাপোলোর প্রযুক্তি দিয়েই তো কাজ চালানো যেত। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। অ্যাপোলোর আমলের সরবরাহ চেইন বা দক্ষ কারিগররা এখন আর নেই। নাসার সাবেক শাটল প্রোগ্রাম ম্যানেজার ওয়েন হেল বলেছিলেন, 'অ্যাপোলোর সমস্যা ছিল একটাই—এটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।'
অ্যাপোলোর কম্পিউটার আজকের স্মার্টফোনের চেয়েও দুর্বল ছিল। নাসা আধুনিক প্রযুক্তির অনেক ব্যবহার করলেও মহাকাশ যাত্রা এত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ যে সরাসরি তুলনা করা যায় না। পৃথিবীর প্রযুক্তি লাখ লাখ মানুষের হাতে পরীক্ষিত হয়, কিন্তু মহাকাশ মিশনের জন্য বিশেষায়িত ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ প্রয়োজন।
আর্টেমিস প্রোগ্রামের মহাকাশযান 'অরিয়ন'-এর কম্পিউটার অ্যাপোলোর চেয়ে ২০ হাজার গুণ দ্রুত এবং এর মেমোরি ১ লাখ ২৮ হাজার গুণ বেশি। অরিয়নে চারজন নভোচারীর জন্য বেশি জায়গা, ব্যায়ামের সুযোগ এবং উন্নত টয়লেট সুবিধা রয়েছে। মুইর-হারমনি জানান, অ্যাপোলোর সময় প্লাস্টিকের ব্যাগে মলত্যাগ করতে হতো, যা ছিল খুবই অস্বস্তিকর। অরিয়নে এখন ছোট হলেও ব্যক্তিগত বাথরুমের সুবিধা আছে।
নতুন উদ্দেশ্য
অ্যাপোলো ছিল শুধু গিয়ে পতাকা পোঁতা আর পায়ের ছাপ রাখার মিশন। কিন্তু নাসার বর্তমান লক্ষ্য হলো চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বা বেস তৈরি করা, যেখানে মানুষ থাকতে ও কাজ করতে পারবে।
বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্পের উত্থান এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। স্পেস-এক্স, বোয়িং এবং ব্লু অরিজিনের মতো কোম্পানিগুলো এখন নাসার অংশীদার। স্পেস-এক্স মঙ্গলের বদলে চাঁদে 'স্বয়ংক্রিয় শহর' গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
নাসার প্রধান ইতিহাসবিদ ব্রায়ান ওডম বলেন, 'বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সরকারের সমর্থন—এই তিনের সমন্বয়েই আমরা এ পর্যায়ে এসেছি।'
চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস ডব্লিউ হেড বলেন, 'চাঁদে দীর্ঘ সময় থাকতে হলে মানবদেহে এর প্রভাব বুঝতে হবে। রোবোটিক মিশনগুলো জানিয়েছে চাঁদের মেরু অঞ্চলে পানি থাকার সম্ভাবনা আছে, যা মানুষের বসবাসের জন্য জরুরি।'
ভূ-রাজনৈতিক চাপ
সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারাতে জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালে চাঁদে মানুষ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের অংশ। আমেরিকা সোভিয়েত প্রভাব নিয়ে চিন্তিত ছিল এবং মহাকাশ অভিযানকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার মনে করত।
আজকের দিনে চীন আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আমেরিকা 'আর্টেমিস অ্যাকর্ডস' নামে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে মিত্রদের এক করছে। ৬০টিরও বেশি দেশ এতে সই করেছে। এটি মহাকাশে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ অভিযানের রূপরেখা দেয়। তবে চীন এতে সই করেনি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ওডম বলেন, 'হয়তো এটি দ্বিতীয় মহাকাশ দৌড়। তবে এবার ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখা হচ্ছে। অ্যাপোলোর শুরুর দিকে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তিন নভোচারীর প্রাণ গিয়েছিল। চ্যালেঞ্জার ও কলম্বিয়া বিপর্যয় থেকেও আমরা শিক্ষা নিয়েছি।'
তিনি বলেন, 'আমরা অনেক কঠিন শিক্ষা পেয়েছি এবং এখন সেগুলো কাজে লাগাচ্ছি।'
