যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের সামরিক সেন্সরের অধীনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কীভাবে কাজ করে
ইসরায়েলে অবস্থানরত প্রতিটি সাংবাদিক—এমনকি সব সাধারণ নাগরিকও—সামরিক সেন্সরশিপের আওতায় রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রণীত এই বিধিমালা, সেন্সর কর্তৃপক্ষকে এমন যেকোনো তথ্য প্রকাশ বা সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়, যা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে পারে বা তেল আবিবের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
যুদ্ধকালীন সময়ে বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এ সময় সামরিক সেন্সর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এমন কোনো ছবি বা ভিডিও সম্প্রচার করা যাবে না, যা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান বা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা সামরিক স্থাপনার অবস্থান প্রকাশ করে—বিশেষ করে লাইভ সম্প্রচারে।
১৯৮৮ সালে জারি করা সেন্সর প্রধানের সাধারণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, "রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো মুদ্রিত উপাদান বা প্রকাশনা ছাপানোর বা প্রকাশের আগে তা সেন্সরের কাছে জমা দিতে হবে।" এই নির্দেশনা মূলত এমন একটি বিধি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে, যা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কার্যকর রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ব্যবস্থা সিএনএন–এর মতো গণমাধ্যমের সংবাদ কভারেজের ওপর কোনো সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ দেয় না। বরং এর উদ্দেশ্য হলো যাতে অসাবধানতাবশত কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলেও সিএনএন বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ থেকেছে বলে দাবি করেছে।
যুদ্ধের সময় গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল একা নয়। উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেনের কথাও বলা যায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দেশটিতে সামরিক আইন জারি রয়েছে এবং সেখানে সংবাদ প্রকাশে কঠোর নিয়ম রয়েছে—যেমন ইউক্রেনীয় সেনাদের কোনো অবস্থান থেকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশ বা ফ্রন্টলাইনের দিকে অস্ত্র বা সাঁজোয়া যানবাহনের বড় ধরনের অগ্রযাত্রার বিস্তারিত প্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেন্সরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তখনই, যখন তারা ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)-এর সঙ্গে এমবেড হয়ে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে সংবাদদল ভিডিও ধারণ করে এবং সম্প্রচারের আগে সেই ফুটেজ সেন্সরের পর্যালোচনার জন্য জমা দেয়—যা অন্য অনেক দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এমবেড রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রচলিত প্রক্রিয়া। সিএনএন অতীতেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর মিশনে অংশ নেওয়া বা নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেখার আগে এমন চুক্তি করেছে।
তবে চলমান যুদ্ধের সময় নিয়মগুলো আরও কঠোর করা হয়েছে।
এই যুদ্ধে ইসরায়েলি জনগণ নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ভিডিওসহ নানা দৃশ্য পোস্ট করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিগ্রাম চ্যানেলে দ্রুত অনুসন্ধান করলেই এমন অসংখ্য ভিডিও পাওয়া যায়। কিন্তু সেন্সর বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওপর নজর দিচ্ছে এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিধিনিষেধ আরও কঠোর করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময়—যখন হাজার হাজার রকেট ইসরায়েলের দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল—তখন দক্ষিণ ও মধ্য ইসরায়েলের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের দৃশ্য দেখাতে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখন সেন্সর ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের লাইভ সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিরোধ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের সব ভিডিও ইসরায়েলি সেন্সরের কাছে যাচাইয়ের জন্য জমা দেয় না। বাস্তবে এর ঠিক উল্টো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শনিবার সকাল থেকে সিএনএন কোনো ভিডিও সেন্সরের কাছে যাচাইয়ের জন্য জমা দেয়নি। তবে সেন্সর এমন লাইভ সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে, যা ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ বা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে পারে।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামির বেন-গাভির সামরিক সেন্সরের বিষয়টিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সেন্সরশিপের নিয়ম ভঙ্গ করলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে "কঠোর ও শূন্য সহনশীলতা" নীতি প্রয়োগ করা হবে।
যোগাযোগমন্ত্রী সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে বেন-গাভির বলেন, পুলিশ ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েছে, "যেখানে সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়েছে। ঘটনাগুলো তদন্ত করা হয়েছে এবং নির্দেশনা লঙ্ঘনের সন্দেহে কয়েকটি ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।"
বেন-গাভির বলেন, "যে কেউ 'সংবাদ প্রতিবেদন' করার নামে ইসরায়েলের নাগরিকদের ঝুঁকিতে ফেলবে, তাকে দৃঢ় ও কঠোর পুলিশি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। এখানে কোনো ছাড় নেই, কোনো খেলা মেনে নেওয়া হবে না।"
