ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে চীনের মতো ‘ভুল’ করবে না যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন কর্মকর্তা
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতে চীনের মতো করা 'ভুল' আর করতে চায় না ওয়াশিংটন। গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমন বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, অতীতে চীনকে দেওয়া অর্থনৈতিক ছাড়গুলো যেভাবে দেশটির উত্থানে সহায়তা করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। এছাড়া তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা যদি ভবিষ্যতে মার্কিন কর্মীদের সঙ্গে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করে, তবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়গা নেওয়া উচিত নয়।
নয়া দিল্লিতে আয়োজিত 'রাইসিনা ডায়ালগ'-এ মার্কিন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিস্টোফার ল্যান্ডউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির রূপরেখা তুলে ধরেন। গত এক বছর ধরে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি এবং কঠিন অভিবাসন আইন গ্রহণ করেছে। গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প তার প্রায় সব প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। রুশ তেলের ওপর ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ জরিমানা এবং তার পাল্টা জবাবে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। যদিও দুই দেশ শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছেছে, কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি।
ল্যান্ডউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী, তবে এই সহযোগিতা হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, '২০ বছর আগে চীনের ক্ষেত্রে আমরা যে ভুলগুলো করেছিলাম, ভারতের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি করব না। তখন আমরা বলেছিলাম, "আমরা তোমাদের এই সকল বাজার গড়ে তুলতে দেব," কিন্তু পরে দেখলাম তোমরাই বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আমাদের হারিয়ে দিচ্ছ।' তিনি আরও যোগ করেন যে, যেকোনো অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই 'আমাদের জনগণের জন্য ন্যায্য' হতে হবে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে ল্যান্ডউ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনা শেষ করে মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করে, তবে তাদের জন্য মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়গা দখল করা ঠিক হবে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়রাই সবচেয়ে বড় অংশ।
তিনি বলেন, 'আমি এমন একটি বিশ্ব চাই যেখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সারা বিশ্ব থেকে আসতে পারবে। তবে আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে যে, এই অভিবাসন আমেরিকান সমাজের জন্য কী সুবিধা নিয়ে আসছে।' তার মতে, 'আমি মনে করি না যে আমাদের নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন লোকদের জায়গা দেওয়া উচিত যারা কেবল চাকরির জন্য আমেরিকানদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে।' তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, অভিবাসন নীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া ট্রাম্পের এইচ-ওয়ানবি (১বি) ভিসা নীতি সংস্কারের ফলে হাজার হাজার ভারতীয় আইটি কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ে বিলম্বের কারণে অনেক কর্মী ভারতে আটকা পড়েছেন। ভারত সরকার এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বৃহত্তর সম্পর্কের কথা ভেবে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবাদ জানায়নি।
পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে ল্যান্ডউ ভারতকে বিকল্প জ্বালানি উৎসের কথা ভাবার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমি আশা করি আপনারা বিকল্প উৎসের কথা ভাবছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প আমার জানা নেই।' তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি 'জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশ' হিসেবে বর্ণনা করে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী চাহিদা মেটাতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারত আবারও রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়েছে। অথচ এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কের চাপে ভারত রুশ তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছিল।
