মার্কিন সাবমেরিন হামলার একদিন পর দ্বিতীয় ইরানি নৌযানের নিয়ন্ত্রণ নিল শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কা তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি নৌযানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ঠিক এক দিন আগে ওই একই জলসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়—যে হামলায় অন্তত ৮৭ জন নিহত হয়েছেন।
'আইরিনস বুশেহর' নামক ওই ইরানি নৌযানটি বুধবার শ্রীলঙ্কার একটি বন্দরে নোঙর করার অনুরোধ জানিয়েছিল কারণ সেটির একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়েছিল। জাহাজটি থেকে প্রায় ২০৮ জন সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কয়েক ঘণ্টা আলোচনার পর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে জাহাজটিকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেন। তিনি বলেন, 'মানবতা রক্ষায় শ্রীলঙ্কা কখনো দ্বিধা করবে না।'
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি নিজেদের নিরপেক্ষতার ওপর জোর দিয়ে বলেছে, ইরান বিরোধী মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মাঝখানে পড়ে গেলেও তারা কোনো পক্ষ নেবে না।
এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে বলেন, 'আমাদের অবস্থান হলো মানবিক মূল্যবোধ প্রদর্শনের পাশাপাশি নিজেদের নিরপেক্ষতাকে সুরক্ষিত রাখা।'
তিনি বৃহস্পতিবার আরও বলেন, 'শ্রীলঙ্কা এমনভাবে হস্তক্ষেপ করেছে যা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা, যা আমাদের দেশের সুনাম ও মর্যাদা রক্ষা এবং মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টাকে ফুটিয়ে তোলে।'
তার এই বক্তব্য এসেছে এমন এক ঘটনার পর, যখন বুধবার একটি মার্কিন সাবমেরিন আইরিস ডেনা নামের একটি ইরানি জাহাজে টর্পেডো হামলা চালায়। জাহাজটি শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৪৪ নটিক্যাল মাইল (৮১ কিলোমিটার) দূরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
প্রায় ১৮০ জন ক্রু বহনকারী এই ফ্রিগেটটি বঙ্গোপসাগরে একটি বহুজাতিক নৌ মহড়ার অংশ ছিল। শ্রীলঙ্কা ভারত মহাসাগরে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে এবং বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
আইরিস ডেনা ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত হতে থাকা সংঘাতের একটি নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই ঘটনাকে 'সমুদ্রে সংঘটিত এক নৃশংসতা' বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য 'তীব্রভাবে অনুতপ্ত হবে'।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার কোনো শত্রু জাহাজকে টর্পেডোর মাধ্যমে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
যদিও ১৯৪৫ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন সাবমেরিন এভাবে জাহাজ ডুবিয়েছে, তবে ব্রিটেন এবং পাকিস্তান উভয় দেশই এর আগে টর্পেডো ব্যবহার করে জাহাজ ডুবিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত ধ্বংস হওয়া ইরানের প্রায় ২০টি নৌযানের একটি হলো আইরিস ডেনা।
বৃহস্পতিবার 'আইরিনস বুশেহর' ইঞ্জিন সমস্যার কথা উল্লেখ করে শ্রীলঙ্কার বন্দরে প্রবেশের অনুমতি চায়।
প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে শেষ পর্যন্ত এটিকে ট্রিনকোমালি বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেন, যদিও জাহাজটি কলম্বো বন্দরের কাছে ছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, কলম্বোতে জাহাজটি ভেড়ালে দেশের সামুদ্রিক শিল্প 'বিরূপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত' হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
আইরিনস বুশেহরের ক্রু সদস্যদের—যাদের মধ্যে ৫৩ জন অফিসার, ৮৪ জন ক্যাডেট অফিসার, ৪৮ জন সিনিয়র নাবিক এবং ২৩ জন নাবিক রয়েছেন—তাদের কলম্বোতে নিয়ে আসা হবে।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী নিখোঁজ থাকা আইরিস ডেনার ক্রু সদস্যদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। আইরিস ডেনা থেকে বেঁচে ফেরা ৩২ জন গুরুতর আহত ব্যক্তিকে বর্তমানে গালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
১৯৪৮ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শ্রীলঙ্কা দীর্ঘস্থায়ীভাবে 'জোট নিরপেক্ষ' নীতি বজায় রেখে আসছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথেই দেশটির শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা ইরান থেকে ২৫ কোটি ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল কিনেছিল এবং মাসিক চা রপ্তানির মাধ্যমে সেই অর্থ পরিশোধ করছে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কায় তৈরি পোশাকের প্রাথমিক গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র।
