ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা মজুত কমায় ইউক্রেন ঝুঁকিতে, লাভবান রাশিয়া
গত কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়েই লাভবান হয়েছে রাশিয়া। কারণ, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র) ব্যবহৃত হচ্ছে—যেগুলো ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের উৎপাদন সংকটের কারণে ইউক্রেনের মজুত তলানিতে ঠেকেছিল। এমনকি ইউরোপীয় মিত্রদেরও নতুন প্যাট্রিয়ট পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার বিমান হামলাগুলো এখন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। এতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে এবং শহরগুলো অন্ধকারে ডুবে থাকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক রুখতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো শত শত ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টানা আক্রমণের মুখে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে মাত্র কয়েক দিনের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট আছে। ফলে ওয়াশিংটনকে হয়তো এখন বাধ্য হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক বা অন্যান্য অঞ্চলের মজুত থেকে এগুলো সরিয়ে আনতে হবে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, এই অভিযান শুরুর পর থেকে ইরান ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ড্রোন ছুড়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, ইরান অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, ২০২৫ সালের জন্য লকহিড মার্টিনের সবচেয়ে উন্নত ইন্টারসেপ্টর 'পিএসি-৩'-এর মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ৬০০টির কিছু বেশি। সাধারণত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে অন্তত দুটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন হয়; আর প্রথম জোড়া ব্যর্থ হলে তার সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং এর জটিল যন্ত্রাংশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যসহ স্পেন থেকেও সংগ্রহ করতে হয়।
ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'আমাদের জন্য এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন।' গত সোমবার (২ মার্চ) সাংবাদিকদের তিনি জানান, ইউক্রেনের অস্ত্র সরবরাহে অর্থায়নকারী ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছে তিনি জানতে চেয়েছেন যে, ইরান সংঘাতের ফলে ইউক্রেনে সরবরাহ আরও কমে যাবে কি না।
ইউক্রেন বিমানবাহিনীর ডেপুটি চিফ কর্নেল পাভলো ইয়েলিজারভ বলেন, 'ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এর একমাত্র সমাধান হলো প্যাট্রিয়ট সিস্টেম। ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এখন প্রতি মাসে প্রায় ৮০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।
ইউক্রেন বিমানবাহিনীর হিসাব মতে, রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় তাদের প্রতি মাসে অন্তত ৬০টি পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর আবেদনের পর জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের এই ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে ন্যাটোর মজুত কতটা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে তা স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, এখন পর্যন্ত কেবল জার্মানিই নিশ্চিতভাবে পাঁচটি সিস্টেম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পেরেছে।
ইউরোপীয় ও ইউক্রেনীয় আলোচকদের মতে, ইন্টারসেপ্টরের এই ঘাটতি রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকেও সংকটে ফেলতে পারে। কারণ ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা নিরাপত্তা গ্যারান্টির একটি প্রধান শর্তই ছিল কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা।
এরই মধ্যে রাশিয়া প্রতিদিন ইউক্রেনে শত শত 'শাহেদ' ড্রোন ছুড়ছে। ইরানের তৈরি এই ড্রোনগুলো ২০২৩ সালের এক প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির পর মস্কো এখন নিজস্ব কারখানায় ব্যাপকহারে উৎপাদন করছে।
