ড্রোন হামলা–বৈরী আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত রাশিয়ার তেল রপ্তানি, দাম বাড়ার সুবিধা নিতে পারছে না মস্কো
ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ও তীব্র শীতকালীন ঝড়ের কারণে রাশিয়ার তেল রপ্তানি কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও—তা থেকে পুরোপুরি লাভ তুলতে পারছে না মস্কো। এমনটাই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট শিল্পের সূত্রগুলো।
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর সোমবার শিসখারিস অয়েল টার্মিনাল–এ তেল লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ওই হামলায় একটি জ্বালানি টার্মিনালে আগুন ধরে যায়। এসময় আশপাশের বেশকিছু ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এবং তিনটি বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত বিস্তৃত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন বিঘ্নিত হচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারেও অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোয় তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং টানা তৃতীয় দিনের মতো সূচক ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
এদিকে তেল ও গ্যাস আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল রাশিয়া। দেশটির বাজেটেও এর প্রভাব পড়ছে। রাশিয়ার মোট বাজেট আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে জ্বালানি খাত থেকে, কিন্তু সেখানে ঘাটতির কারণে ফেডারেল বাজেট ঘাটতি বাড়ছে।
গত এক সপ্তাহে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর বাড়ার বড় সুবিধাভোগী হতে পারত মস্কো। কিন্তু, আলোচিত পরিস্থিতি সেখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নোভোরোসিস্ক টার্মিনাল এখনও বন্ধ
সর্বশেষ এলএসইজি তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাল্টিক অঞ্চলের বন্দরগুলোতে রাশিয়ার উরাল ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৫১ দশমিক ৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, মঙ্গলবার দাম আরও বাড়তে পারে।
তবে ড্রোন হামলা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রধান তেল স্থাপনাগুলোতে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়ার রপ্তানিকারকেরা সরবরাহ বাড়াতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মাসে প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল তেল লোডিংয়ের সক্ষমতা থাকা নোভোরোসিস্ক বন্দরের শিসখারিস টার্মিনাল মঙ্গলবারও বন্ধ ছিল। কবে থেকে আবার লোডিং শুরু হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জ্বালানি তেল বাণিজ্যের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, সবচেয়ে দ্রুত হলে আজ বা কালকে (৫ বা ৬ মার্চ) টার্মিনালটি চালু করা হতে পারে, তবে সেই সম্ভাবনা কতোটা তা বলা যাচ্ছে না।
রাশিয়ার প্রধান তেল পাইপলাইন অপারেটর ট্রান্সনেফট এবং নোভোরোসিস্ক বন্দর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বরফাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে বিকল্প রুটও বাধাগ্রস্ত
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বাল্টিক অঞ্চলের প্রিমরস্ক বন্দর ও উস্ত-লুগা বন্দরে নোভোরোসিস্ক দিয়ে রপ্তানির জন্য সরবরাহ করা তেল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তীব্র বরফাচ্ছন্ন পরিস্থিতির কারণে এসব বন্দরের লোডিং সক্ষমতা অনেক কমে গেছে।
এদিকে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত "ছায়া বহরের" ট্যাংকার জব্দ করার অভিযানও জোরদার করেছে। এসব জাহাজের মালিকানা সাধারণত অস্পষ্ট থাকে এবং নিরাপত্তা মানও শিথিল থাকে।
কাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম (সিপিসি) পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরানোর বিকল্প পথও সীমিত। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেখানে বিলম্বও হচ্ছে এবং পাইপলাইনের বড় অংশের সক্ষমতা ব্যবহার করছে কাজাখস্তান, দেশটির তেংগিজ তেলক্ষেত্র ধীরে ধীরে উৎপাদন পুনরুদ্ধার করছে।
হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ায় তেল সরবরাহকারী দ্রুজবা পাইপলাইনের প্রবাহ এখনও বন্ধ রয়েছে। দুই দেশ এই স্থগিতের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করলেও কিয়েভ বলছে, পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে রাশিয়া—তাই চালু করা যাচ্ছে না।
তবে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য অঞ্চলে তেল রপ্তানি প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চে কোজমিনো বন্দর থেকে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল জাহাজে লোডিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
