ড্রোন হামলা চালিয়ে মাসের পর মাস হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারবে ইরান
গোয়েন্দা সূত্র এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ড্রোন হামলা হরমুজ প্রণালীতে কয়েক মাস ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। তবে দেশটি কতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারবে তা এখনও অস্পষ্ট।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলার পর থেকে দেশটি ওয়াশিংটনের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হলেও, কিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, অবকাঠামো এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃহৎ ড্রোন প্রস্তুতকারক
ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স' (সিআইআর) -এর মতে, ইরান একটি বৃহৎ ড্রোন উৎপাদনকারী দেশ এবং তাদের প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরির শিল্প সক্ষমতা রয়েছে।
তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের আকার এখনও অজানা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মতে এটি আড়াই হাজারটি, আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে এর পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার। ইরানের অস্ত্রাগারে আর কী পরিমাণ অস্ত্র অবশিষ্ট আছে, তা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ যে সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইরানের হামলায় ছয়টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ধমনী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানির দাম লাফিয়ে বেড়েছে; এই সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালি বলেন, 'ইরান সহজে বা দ্রুত হার মানবে না। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক যাতায়াত অনিরাপদ করে তোলার মতো সরঞ্জাম তাদের কাছে আছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সেই সব গোলাবারুদ ও ঘাঁটিতে আক্রমণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে যা হরমুজ প্রণালীর জন্য হুমকি। কিন্তু ইরানকে কেবল প্রমাণ করতে হবে যে তারা দু-একটি ট্যাঙ্কারে আঘাত করতে পারে, বাকি কাজ মানুষের উদ্বেগই সেরে দেবে—কেউ আর ওই পথ দিয়ে যেতে চাইবে না।'
ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ: একটি দুর্বল জায়গা
ব্রিটেনের গোয়েন্দা সং এম১৬-এর একজন সাবেক পরিচালকের মতে, কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ইরানের জন্য একটি দুর্বল জায়গা।
তিনি বলেন, 'রাশিয়া বর্তমানে ইরানকে পুনরায় অস্ত্র সরবরাহ করার মতো অবস্থায় নেই এবং চীন এ বিষয়ে বেশ সতর্ক থাকবে। যদি জানা যায় যে চীন ইরানকে কোনো ধরনের গুরুতর সামরিক হার্ডওয়্যার সরবরাহ করছে, তবে জিসিসি দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক খুব খারাপ হবে।'
আরেকটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহের কারণে ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুত কমে গিয়ে থাকতে পারে। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের মতে, গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও এই মজুত হ্রাস পেয়েছিল, যা বর্তমানে আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
সিআইআর-এর গবেষণা অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার বা নিক্ষেপক যন্ত্রের অভাব একটি বড় সীমাবদ্ধতা হতে পারে। ইসরায়েল ও মার্কিন হামলার কারণে গত এক বছরে এই লঞ্চারের সরবরাহ অন্তত অর্ধেক কমে গেছে এবং গত পাঁচ দিনে তা আরও হ্রাস পেয়েছে।
তা সত্ত্বেও, ইরান তার ড্রোন দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমির মতে, ইরানের সর্বশেষ প্রজন্মের 'শাহেদ-১৩৬' ড্রোনের পাল্লা ৭০০ থেকে এক হাজার কিলোমিটার, যা মূল ভূখণ্ড বা জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করলে দক্ষিণ উপসাগরীয় উপকূলের যেকোনো স্থানে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট।
সামুদ্রিক মাইন সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে
হরমুজ প্রণালীতে যাতায়াত কতদিন বিঘ্ন ঘটবে তা স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথে তেল ব্যবসায়ীরা দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
গ্লোবাল কমোডিটি ট্রেডিং হাউস ভিটোল-এর একজন শীর্ষ নির্বাহী বলেন, 'আমি খুবই চিন্তিত, বর্তমানে তেলের বাজারে এই ঝুঁকিটিকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'প্রচলিত তত্ত্ব হলো, ইরান প্রথমে পুরানো মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিঃশেষ করছে। যদি তাই হয়, তবে তাদের আসল পাল্টা আক্রমণ এখনও শুরুই হয়নি।'
তবে তিনি বলেন, যদি মিসাইল এবং ড্রোন ফুরিয়ে যেতে শুরু করে, তাহলে ইরান সামুদ্রিক মাইন মোতায়েন শুরু করতে পারে।
মেরিটাইম রিস্ক ইন্টেলিজেন্স ফার্ম 'ড্রায়াড গ্লোবাল'-এর মতে, তেহরানের কাছে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার মাইন রয়েছে।
এগুলো সমুদ্রতলে আটকে রাখা যায় বা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া যায়, যা কোনো জাহাজের সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরিত হয়। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালীতে মাইন বিছানোর কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
তবে 'কন্ট্রোল রিস্কস'-এর পরিচালক করম্যাক ম্যাকক্যারি সতর্ক করেছেন যে, 'যদি সামুদ্রিক মাইন বিছানো হয়, তবে সেগুলো সরাতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে আমাদের কয়েক মাস ধ্বংসলীলা দেখতে হতে পারে।'
