কার ক্ষেপণাস্ত্র আগে ফুরোয়, তাতেই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জয়-পরাজয়: বিশ্লেষকরা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের পরিণতি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করছে একটি হিসাবনিকাশের ওপর। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে হিসাবটি হলো—একদিকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা।
গত শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ও জোরালো সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে ইরান এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এর অংশ হিসেবে ১ হাজার ২০০ মাইল এলাকাজুড়ে থাকা প্রায় এক ডজন দেশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এক হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে তারা।
তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বিমানবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো সক্ষমতা ইরানের পুরোনো বিমানবাহিনীর নেই। তাই তেহরান মূলত তাদের মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপরই ভরসা করছে।
ইরানের এই পাল্টা হামলার ভৌগোলিক বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সংঘাতে রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তবে এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো উড়োজাহাজ ভূপাতিত হয়নি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও সামরিক অবকাঠামো যতটা সম্ভব ধ্বংস করে দেওয়া। এ জন্য তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, অস্ত্রাগার ও সংশ্লিষ্ট সামরিক সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের 'সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি'র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক স্ট্যাসি পেটিজন বলেন, এই সংঘাত অনেকটা 'কৌশলগত পাল্লা দেওয়ার' পর্যায়ে চলে গেছে। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় 'স্যালভো কমপিটিশন'—যখন প্রতিপক্ষ একে অপরের দিকে একসঙ্গে প্রচুর নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র ছুড়ে মারে।
গত মঙ্গলবার জেরুজালেমের আকাশে আবারও সাইরেন বেজে ওঠে এবং ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার সময় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলে অন্তত ১১ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তবে গত ৩৬ ঘণ্টায় দেশটিতে ইরানের হামলার মাত্রা কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, দেশটিতে ৭শ ৮৭ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান সম্ভবত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সংরক্ষণের চেষ্টা করছে অথবা হয়তো তারা এখন আর সেভাবে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা হারিয়েছে।
পেটিজন বলেন, 'ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এমন অস্ত্রের সংখ্যা ইরানের হাতে খুব একটা বেশি নেই। বরং পারস্য উপসাগরে আঘাত হানতে পারে, এমন অস্ত্রের মজুতই তাদের বেশি। আর ইসরায়েল অভিমুখে ছোড়া ড্রোনগুলোর বেশির ভাগই ঠেকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরানের শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারদের হত্যার কারণে তারা কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্যই তারা সুসংগঠিতভাবে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারছে না। বরং যখন যেটুকু সম্ভব, সেভাবেই তারা হামলা চালাচ্ছে।'
তেহরানের আরেকটি কৌশল হতে পারে—শত্রুপক্ষের নাগরিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচ বাড়িয়ে তাদের দুর্বল করে ফেলা।
ইসরায়েলভিত্তিক 'মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভাইজরি অ্যালায়েন্স'-এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তাল ইনবার বলেন, 'শতভাগ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বলে কিছু নেই। এটা মূলত একে অপরকে দুর্বল করার যুদ্ধ...। যদি একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্রও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জায়গায় আঘাত হানে, তবে তার খেসারত অনেক বেশি হতে পারে।'
গত গ্রীষ্মে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে ব্যাপক হারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত অনেক কমে গিয়েছিল।
ইনবার বলেন, 'আগের যুদ্ধ ও সংঘাতগুলোর স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করত আমাদের কাছে মজুত থাকা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর। আর সত্যি কথা হলো—প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কখনোই পর্যাপ্ত হয় না।'
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবার একটি দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে যে খবর ছড়িয়েছে, তা সত্য নয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'আমিরাতের কাছে পর্যাপ্ত সামরিক মজুত রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করবে।'
সোমবার আমিরাত জানায়, এখন পর্যন্ত তাদের দিকে ছোড়া ১৭৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৬১টি তারা ধ্বংস করেছে এবং বাকিগুলো সাগরে পড়েছে। এ ছাড়া মোট ৬৮৯টি ইরানি ড্রোনের মধ্যে ৬৪৫টি ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আটটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, যার ফলে কিছু 'ক্ষয়ক্ষতি' হয়েছে।
ইরান কাতারের পাশাপাশি আবুধাবি, কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন ও ওমানের মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে। দুবাইয়ের কয়েকটি আন্তর্জাতিক হোটেলেও হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে।
কাতারও একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা 'একাধিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার চেষ্টা শনাক্ত করেছে এবং সেগুলোর বেশির ভাগই সফলভাবে প্রতিহত করেছে।' দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা দুটি ইরানি যুদ্ধবিমান, তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ১০১টির মধ্যে ৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯টির মধ্যে ২৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের কৌশলগত ও সামরিক বিশ্লেষক কেলি গ্রিয়েকো বলেন, 'উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এসব অস্ত্রের মজুত ঠিক কতটা, তা জানা খুব কঠিন। তবে তারা প্রচুর অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং শিগগিরই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা ঠিক কী কী রক্ষা করতে চায়।'
গ্রিয়েকো আরও বলেন, 'ইরানিরা এটি জানে বলেই তাদের হামলার মাত্রা খুব বড় নয়। তারা মূলত এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। এটি দুর্বল পক্ষের জন্য তুলনামূলক বেশি কার্যকর একটি কৌশল।'
পেটিজন মনে করেন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে গেলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণাত্মক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে এবং কোনো একটা মীমাংসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে।
পেটিজন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করতে পারে, কিন্তু ইসরায়েল তা পারবে না। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। যদি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যায়... তাহলে তারা হয়তো শান্তির প্রস্তাব দেবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।'
এই যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর বিপুল ব্যয় এবং এর সীমিত মজুতও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিয়েকোর মতে, একটি ড্রোন তৈরি করতে যা খরচ হয়, সেটিকে আকাশেই ধ্বংস করতে এর পাঁচ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়। আবার সবচেয়ে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রের মজুতও খুব সীমিত এবং এগুলো ধীরে ধীরে তৈরি করতে হয়। এর বাইরে ইউক্রেন বা তাইওয়ানের মতো অঞ্চলেও এসব অস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
