উপসাগরে যুদ্ধঝুঁকি কাভারেজ বাতিল সামুদ্রিক বীমাকারীদের: জ্বালানির দর কি আরও বাড়বে?
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য তাদের নৌবীমার 'যুদ্ধ ঝুঁকির' কাভারেজ বাতিল করেছে বীমা কোম্পানিগুলো। চলমান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ দিয়ে যাত্রার সময় জ্বালানিবাহী ট্যাংকার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া, দুজন ক্রু'র প্রাণহানি এবং চালান ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এসেছে এই সিদ্ধান্ত, এতে তেল-গ্যাস পরিবহনের ব্যয় দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দর আরও বাড়তে পারে।
আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এ যুদ্ধ গড়িয়েছে চতুর্থ দিনে। ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহত রেখেছে তীব্র হামলা। এরমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। তেহরানের পাল্টা আঘাতের শিকার হচ্ছে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোও, যেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
এরমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে পড়েছে। এপর্যন্ত ইরানি হামলায় অন্তত পাঁচটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দু'জন ক্রু নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১৫০টি জাহাজ উপসাগরীয় জলসীমায় আটকে আছে বলে বিভিন্ন শিপ-ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য জানাচ্ছে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছে— হরমুজ প্রণালি পেরোতে চাওয়া জাহাজগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে।
সোমবার আইআরজিসি'র একজন কমান্ডারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়েছে বলে জানান।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে হন্ডুরাসের পতাকাবাহী নোভা, যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী স্টেনা ইমপ্যারেটিভ, মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমকেডি ভিওম এবং জিব্রাল্টারের পতাকাবাহী হারকিউলিস স্টার। কয়েকটি জাহাজে ড্রোন অথবা মিসাইলের আঘাতের খবর এসেছে।
বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ কনটেইনার জাহাজ এই বিস্তৃত জটের জালে আটকে পড়েছে—ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার বন্দর ও ট্রানশিপমেন্ট হাবে শিগগিরই কার্গো জমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে কনটেইনার ক্যারিয়ার ওশান নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস-এর প্রধান নির্বাহী জেরেমি নিক্সন সতর্ক করেছেন। শিপ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক, সৌদি আরব ও বিশেষ করে কাতারের উপকূলের উন্মুক্ত জলসীমায় ট্যাংকারগুলো জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছে।
হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি
ইরানি সংবাদমাধ্যম মঙ্গলবার জানায়, হন্ডুরাসের পতাকাবাহী নোভা নামের জাহাজে দুটি ড্রোন আঘাত হানার পর সেটি হরমুজ প্রণালিতে আগুনে পুড়ছে বলে আইআরজিসি জানিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী স্টেনা ইমপ্যারেটিভ উপসাগরে নোঙর করা অবস্থায় আকাশ থেকে করা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—জাহাজটির মালিকানা সংস্থা স্টেনা বাল্ক ও ব্যবস্থাপক ক্রাউলি এ তথ্য দিয়েছে। ওই হামলায় একজন শিপইয়ার্ড কর্মী নিহত হন।
রোববার ওমান উপকূলে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমকেডি ভিওমে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক নাবিক নিহত হন; এসময় আরও দুটি ট্যাংকার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই দিনে আমিরাতের উপকূলে জিব্রাল্টারের পতাকাবাহী হারকিউলিস স্টার-ও আক্রান্ত হয়। এরপর জাহাজটি দুবাইয়ে ফিরে এসে নোঙর করেছে, জাহাজের ক্রুরা নিরাপদে আছেন বলেও জানানো হয়েছে।
সামুদ্রিক বীমা বাজারের প্রতিক্রিয়া
ঘটনাগুলোর পর একাধিক নৌবীমা প্রদানকারী তাদের গ্রাহকদের যুদ্ধ ঝুঁকির কাভারেজ বাতিলের নোটিশ দিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে থাকা জাহাজগুলোকে নতুন বীমা নিতে হবে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
গার্ড, স্কাল্ড, নর্থস্ট্যান্ডার্ড, লন্ডন পি অ্যান্ড আই ক্লাব ও আমেরিকান ক্লাবসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটে ১ মার্চ তারিখে জারি করা নোটিশে জানায়, ৫ মার্চ থেকে যুদ্ধঝুঁকি কভার বাতিল কার্যকর হবে।
মেরিন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ম্যাকগিল অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রধান ডেভিড স্মিথ বলেন, দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আন্ডাররাইটাররা বীমা প্রিমিয়ামের হার বাড়াচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজের জন্য এই মুহূর্তে শর্তসাপেক্ষে বীমা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
বীমা শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৪৮ ঘণ্টায় যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম জাহাজের মূল্যের ১ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে, যেখানে গত সপ্তাহে তা ছিল প্রায় ০.২ শতাংশ। ফলে প্রতিটি চালানে কয়েক লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ কোটি ডলার মূল্যের একটি ট্যাংকারের ক্ষেত্রে একবারের যাত্রায় প্রিমিয়াম প্রায় ২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ১০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সমুদ্রপথে যুদ্ধঝুঁকি বিশেষজ্ঞ ভেসেল প্রটেক্ট (পেন আন্ডাররাইটিংয়ের অংশ)-এর মনরো অ্যান্ডারসন বলেন, "বাস্তব অবরোধের চেয়ে হুমকির ভিত্তিতেই কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে, এমন ধারণা থেকেই বাজার আচরণ করছে।"
বিশ্লেষক ও বাজার সূত্রগুলো জানান যে উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই ছয় বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় জাহাজে তেল পরিহনের খরচ, এবং এখন তা আরও বাড়ার দিকে রয়েছে। কারণ যুদ্ধ পরিবেশে জাহাজ মালিকরা ঝুঁকির কারণে ওই অঞ্চলে জাহাজ পাঠাতে চাইছে না, ফলে ভাড়ার হার ও বীমা খরচের বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
