রেকর্ড সংখ্যায় দেশত্যাগ করছেন আমেরিকানরা, বিদেশে খুঁজছেন নতুন ঠিকানা
অভিবাসীদের দেশ–এমন পরিচিতিই ছিল আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের এক চিরচেনা রূপ। কিন্তু, দেশটির স্বাধীনতার ২৫০তম বছরে এসে প্রশ্ন উঠছে—অভিবাসীদের দেশ আমেরিকা কি ধীরে ধীরে দেশত্যাগীদের দেশে পরিণত হচ্ছে?
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে এমন প্রবণতা দেখা গেছে, যা মহামন্দার পর থেকে আর কখনো এত স্পষ্টভাবে ঘটেনি। সেটা হচ্ছে, এই সময়ে দেশটিতে যত মানুষ থাকতে এসেছে, তার চেয়েও বেশি দেশ ছেড়েছে।
অবশ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নেতিবাচক এই অভিবাসনের নিট ফলাফলকেই নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য, এটি ব্যাপক হারে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার ও নতুন ভিসা সীমিত করার নীতির ফল। তবে কঠোর অভিবাসন নীতির আড়ালে আরেকটি বাস্তবতা নিয়ে তেমনভাবে আলোচনা হচ্ছে না, যা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতা বলছে, রেকর্ড সংখ্যায় মার্কিন নাগরিকরাই দেশ ছেড়ে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বলে মনে করা দেশগুলোতে নতুন করে বসতি গড়ছেন।
প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের দেশত্যাগের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আর সংরক্ষণ করেনি। তবে ৫০টির বেশি দেশের আবাসিক পারমিট, বিদেশে বাড়ি কেনা, শিক্ষার্থী ভর্তি এবং অন্যান্য সূচক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—অভূতপূর্ব মাত্রায় মার্কিন নাগরিকরা বিদেশে স্থায়ী হচ্ছেন। লাখ লাখ আমেরিকানদের একটি প্রবাসী সমাজ এখন বিদেশে পড়াশোনা, দূরবর্তীভাবে কাজ ও অবসর জীবনযাপন করছে।
এমনকী অনেকের কাছে এখন নয়া 'আমেরিকান ড্রিম' মানে—আর আমেরিকায় না থাকা।
পাথর-বিছানো রাস্তা আর নানান ঐতিহ্য বুকে নিয়ে গড়ে উঠেছে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন। সেখানে এখন এত বেশি আমেরিকান অ্যাপার্টমেন্ট কিনছেন যে, নতুন যারা আসছেন তারাই অনুযোগ করে বলছেন, চারপাশে এখন পর্তুগিজের চেয়ে ইংরেজিই বেশি শোনা যায়।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের গ্র্যান্ড ক্যানাল ডক এলাকায় প্রতি ১৫ জন বাসিন্দার একজন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছেন। স্থানীয় আবাসন ব্যবসায়ীদের মতে, উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আমেরিকানদের হারকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু ইউরোপেই নয়, এশিয়ার অনেক দেশেও নতুন ঠিকানা গড়ছেন মার্কিনীরা। ইন্টারনেটের যুগে সেখান থেকেই করছেন আমেরিকায় অফিসের কাজ। দূরবর্তী এই কাজের সুবিধা থাকায় ইন্দোনেশিয়ার বালি ও থাইল্যান্ডে ডলারে আয় করা আমেরিকানদের সংখ্যা এখন বাড়বাড়ন্ত। একই অবস্থা দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়াতেও। এদের কারণে স্থানীয় আবাসনের বাজার এতটাই চড়েছে যে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দেখা যাচ্ছে।
বিদেশে কম খরচে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেওয়ার আশায় ১ লাখের বেশি আমেরিকান তরুণ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আবার মেক্সিকো সীমান্তের ওপারে গড়ে ওঠা বহু নার্সিং হোমে কম খরচে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন প্রবীণ আমেরিকানরা।
গত মাসে 'এক্সপ্যাটসি' নামের একটি পুনর্বাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনলাইন কনফারেন্সে প্রায় ৪০০ আমেরিকান আলবেনিয়ায় যাওয়ার উপায় জানতে নিবন্ধন করেন। সাবেক স্টালিনপন্থী এই দেশটি মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিশেষ ভিসা দেয়, যেখানে এক বছর বিদেশি আয়ে কোনো কর দিতে হয় না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জেন বার্নেট বলেন, আগে যারা দেশ ছাড়তেন তারা ছিলেন সাহসী ও উচ্চশিক্ষিত। এখন সাধারণ মানুষও যাচ্ছেন। ২০২৪ সালে তাদের তিনটি গ্রুপ সফর ছিল, চলতি বছরে তা বেড়ে ৫৭টিতে দাঁড়াবে। তার লক্ষ্য—১০ লাখ আমেরিকানকে আলবেনিয়ায় অভিবাসনে সাহায্য করা।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসনের এই সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়—অনেকে এই প্রবণতাকে 'ডোনাল্ড ড্যাশ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে দূরবর্তী কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, আমেরিকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ইউরোপীয় জীবনযাপনের আকর্ষণ—এসব কারণেও প্রবণতাটি অনেক বছর ধরেই বাড়ছিল।
হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র অবশ্য দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ফলে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, পাশাপাশি ধনী বিদেশিরা 'গোল্ড কার্ড' কর্মসূচিতে ১০ লাখ ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিচ্ছেন।
কিন্তু ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের হিসাব বলছে অন্য কথা। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিট ১ লাখ ৫০ হাজার নাগরিক হারিয়েছে অভিবাসনে, এবং ২০২৬ সালে এই প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে বসবাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র মোট আগমন ছিল প্রায় ২৬–২৭ লাখ জনের, যেখানে ২০২৩ সালে তা প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছেছিল।
সে তুলনায়, গত বছর ৬ লাখ ৭৫ হাজার জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর ২২ লাখ মানুষ স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরেছে বলে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্যে দেখা যাচ্ছে।
১৫টি দেশের অভিবাসনের সাময়িক তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দেখেছে, অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার আমেরিকান ২০২৫ সালে এসব দেশে গেছেন। যদিও বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বর্তমানে বিদেশে বসবাসরত আমেরিকানদের সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৯০ লাখের মধ্যে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
মেক্সিকোতে ২০২২ সালে ১৬ লাখ মার্কিন নাগরিক ছিলেন। এই সংখ্যা বর্তমানে আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কানাডায় আছেন আড়াই লাখেরও বেশি আমেরিকান। যুক্তরাজ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজারের বেশি, আর ইউরোপজুড়ে এই সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় সব দেশেই আমেরিকানদের আগমনের হার রেকর্ড পর্যায়ে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে পর্তুগালে মার্কিন বাসিন্দা ৫০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। স্পেন ও নেদারল্যান্ডসে প্রায় দ্বিগুণ, চেক প্রজাতন্ত্রে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালে জার্মানিতে যত আমেরিকান গেছেন, তত জার্মান যুক্তরাষ্ট্রে যাননি। আয়ারল্যান্ডে ২০২৫ সালে ১০ হাজার মার্কিন নাগরিক গেছেন, যা আগের বছরের দ্বিগুণ।
মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনও বেড়েছে, ২০২৪ সালে যা ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন ৬ হাজার ৬০০ মার্কিনী, আইরিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদনের সংখ্যা ৪০ হাজারের কাছাকাছি।
আলবেনিয়া, রোমানিয়া, স্পেন, স্কটল্যান্ড—বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন আমেরিকার মধ্যবিত্ত উদ্যোক্তা, অবসরপ্রাপ্ত, সামাজিক নিরাপত্তাভাতা-নির্ভর মানুষ, এমনকি সন্তানসহ পুরো পরিবারও যাচ্ছে। অনেকের যুক্তি—যুক্তরাষ্ট্রে আয় বেশি হলেও ইউরোপে জীবনমান ভালো। স্বাস্থ্যসেবা সস্তা, শহরগুলো হাঁটা-চলার উপযোগী, বিদ্যালয়গুলো নিরাপদ ও আরও মানসম্মত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাহীনতারও ইঙ্গিত বহন করে। আমেরিকান অনেক প্রবাসী এর কারণ হিসেবে, নিজ দেশে সহিংসতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা—এসব কারণ উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালের গ্যালোপ জরিপে দেখা যায়, ওই সময়ে ১০ শতাংশ আমেরিকান দেশ ছাড়তে চাইতেন। গত বছরের জরিপকালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে।
ইউরোপীয় দেশগুলোও ভিসা নীতি সহজ করে, কর সুবিধা দিয়ে এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে, ইউরোপ থেকে ১৮ হাজার ধনী ব্যক্তি দেশ ছেড়েছেন, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন মাত্র সাড়ে ৭ হাজার—হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যে এমনটি উঠে এসেছে।
তবে সামগ্রিক চিত্রে স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের জন্য প্রবেশ কমছে, আর দেশত্যাগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—এই দেশত্যাগ কি শক্তিশালী অর্থনীতির বহিঃপ্রকাশ, নাকি আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাহীনতার প্রতীক?
তবে পরিসংখ্যান বলছে, প্রবণতাটি আর সাময়িক নয়; বরং এটি এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
