বিচার বিভাগে দুর্নীতি নিয়ে অধ্যায় থাকায় ৮ম শ্রেণির পাঠ্যবই নিষিদ্ধ করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
ভারতে অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে 'বিচার বিভাগে দুর্নীতি'-সংক্রান্ত একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত করায় দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ওই বই নিষিদ্ধ করেছে। বইটির সমস্ত হার্ডকপি বাজেয়াপ্ত ও ডিজিটাল সংস্করণ ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।
একইসঙ্গে সর্বোচ্চ আদালত ন্যাশনাল কাউন্সিল অভ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং-এর (এনসিইআরটি) পরিচালক এবং স্কুল শিক্ষা বিভাগের সচিবের বিরুদ্ধে কেন ফৌজদারি আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ পাঠ্যবইয়ে বিচার বিভাগে দুর্নীতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করাকে বিচার বিভাগকে কালিমালিপ্ত করার 'পরিকল্পিত পদক্ষেপ' ও 'গভীর ষড়যন্ত্র' আখ্যা দেওয়ার পরদিনই এই নির্দেশনা এল।
এনসিইআরটি 'অনুপযুক্ত বিষয়বস্তুর' জন্য দুঃখ প্রকাশ করা সত্ত্বেও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জানায়, কর্তৃপক্ষের জবাবে অনুশোচনার অভাব ছিল এবং তারা বিষয়টিকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করেছে বলে মনে হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলে, 'আমরা এনসিইআরটির নোটিশটি দেখেছি; সেখানে ক্ষমার কোনো সহজ শব্দও নেই। এই পরিচালক যেভাবে নোটিশটি তৈরি করেছেন, তাতে কোনো অনুশোচনা নেই বরং বিষয়টিকে যুক্তিসংগত করার চেষ্টা রয়েছে...এটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে।'
সরকারের পক্ষ থেকে যখন জানানো হয়, এই অধ্যায়টি তৈরির সাথে যুক্ত দুই ব্যক্তিকে আর মন্ত্রণালয়ের কাজের সাথে রাখা হবে না, তখন আদালত একে অত্যন্ত 'লঘু পদক্ষেপ' হিসেবে অভিহিত করে। আদালত বলেন, 'তারা গুলি ছুড়েছেন এবং বিচার বিভাগ আজ রক্তাক্ত। বিচারকরা বলছেন, তাদের মনোবল ভেঙে গেছে; মানুষ এই বিষয়ে নেতিবাচক আলোচনা করছে।'
আদালতের বেঞ্চ আরও বলে, বিষয়টি কেবল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। 'শিক্ষকরা প্রথমে জানবেন "পুরো বিচার বিভাগই দুর্নীতিগ্রস্ত"... তারপর অভিভাবকরা এটি শিখবেন। এটি বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করার গভীর ষড়যন্ত্র।'
অনলাইনে বইটির অংশবিশেষ ছড়িয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে আদালত বলে, 'আমরা আশা করি সরকার এটি ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেবে। রাষ্ট্রকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে।'
আদালতের লিখিত আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত 'এক্সপ্লোরিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড' শীর্ষক প্রকাশনাটি সম্পর্কে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়ে তারা 'স্তম্ভিত' হয়েছে। আদালত লক্ষ করেছে, ওই অধ্যায়ে 'আমাদের সমাজে বিচার বিভাগের ভূমিকা' আলোচনার সময় বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টিই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং বিচার বিভাগের নিষ্ক্রিয়তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আদালত স্পষ্ট করেছে, এই আইনি কার্যক্রমের উদ্দেশ্য কোনো 'যৌক্তিক সমালোচনাকে স্তব্ধ করা' নয়। তবে বেঞ্চের মতে, 'গঠনমূলক বয়সে' শিক্ষার্থীদেরকে এ ধরনের 'একপেশে বর্ণনার' মুখোমুখি করা তাদের মনে স্থায়ী ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট এনসিইআরটিকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য শিক্ষা বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বইটির সমস্ত হার্ডকপি ও ডিজিটাল সংস্করণ অবিলম্বে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বইটির উৎপাদন ও বিতরণের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এটি প্রচারের যেকোনো চেষ্টা আদালতের আদেশের 'ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন' হিসেবে গণ্য হবে।
এনসিইআরটির পরিচালককে বিতরণ করা সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা নিয়ে এ বিষয়ে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সব রাজ্যের শিক্ষা সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো পাঠদান না করা হয়।
এছাড়া যে জাতীয় পাঠ্যক্রম বোর্ড এই অধ্যায়টি প্রস্তুত করেছে, সেটির সদস্যদের নাম-পরিচয় এবং যে সভায় এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল তার মূল কার্যবিবরণী জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
