চীনে সরকারি চাকরি পেতে জালিয়াতি, প্রতিদ্বন্দ্বী কমাতে ‘ভুতুড়ে’ প্রার্থীর ফাঁদ
চীনে সরকারি চাকরির পরীক্ষার জগতটা কতটা কঠিন, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।দেশটিতে চাকরির বাজার এখন বেশ কঠিন। তাই নিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রতি তরুণদের আগ্রহও তুঙ্গে। তবে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাশের সিটে বসা পরীক্ষার্থীটি আপনার আসল প্রতিদ্বন্দ্বী নাও বা হতে পারেন; বরং এখন পরীক্ষার্থীদের মূল ভয়ের কারণ অদৃশ্য 'ভুতুড়ে' প্রার্থী!
বিষয়টি শুনে অদ্ভুত ঠেকলেও চীনে এখন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় এমনই এক প্রতারণার ঘটনা বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
কৌশলটি হলো—আবেদনকারীর সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো, যাতে বিপুল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দেখে ভয়ে আসল প্রার্থীরা পিছু হটে যান বা পরীক্ষা দিতেই না আসেন।
চীনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আদালতের এক রায়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে। একজন প্রার্থী সরকারি চাকরির পরীক্ষার আবেদন করতে গিয়ে দেখেন, তাঁর নাম-পরিচয় ব্যবহার করে আগেই একটি পদের জন্য নিবন্ধন করা হয়ে গেছে, অথচ তিনি ওই পদের জন্য আবেদনই করেননি। মূলত এরপরই এই 'ভুতুড়ে' প্রার্থী বা ভুয়া আবেদনের জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসে।
ভুক্তভোগী ওই প্রার্থী বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তে দেখা যায়, লি নামের এক ব্যক্তি ও ঝৌ নামের এক শিক্ষকের যোগসাজশেই এসব হয়েছে। ঝৌ মূলত সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, ঝৌয়ের অর্থায়নে লি অনলাইনের এক বিক্রেতার কাছ থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কেনেন। এরপর লি ও ঝৌ মিলে গত দুই বছরে সাত শতাধিক ভুয়া নিবন্ধন করেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঝৌয়ের কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের সুবিধা দেওয়া।
নির্দিষ্ট কিছু পদে আবেদনকারীর সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোই ছিল তাদের মূল কৌশল। এতে প্রতিযোগিতার হার অনেক বেশি মনে করে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভয়ে আর ওই পদের দিকে পা বাড়াতেন না বা আবেদন করতেন না।
চীনা গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই জালিয়াতির জন্য শিক্ষক ঝৌ সহযোগী লি-কে ২৫ হাজার ৬২৫ ইউয়ান (প্রায় ৩ হাজার ৭০০ ডলার) দিয়েছিলেন।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের দায়ে লি ও চেনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত। রায়ে দুজনকেই কারাদণ্ড ও সাথে জরিমানাও করা হয়। তবে মূল পরিকল্পনাকারী শিক্ষক ঝৌয়ের মামলাটি আলাদাভাবে বিচার করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আপাতদৃষ্টিতে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার গলদ তো বটেই, সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, তা নিয়েও চলছে বিতর্ক।
চীনে সরকারি চাকরিকে বলা হয় 'আয়রন রাইস বাউল'।মানে হলো, একবার এই চাকরি পেলে জীবন নিশ্চিত। চমৎকার চাকরির নিরাপত্তার পাশাপাশি আবাসন ও চিকিৎসাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় এতে।
দেশটির অর্থনীতির চাকা এখন কিছুটা মন্থর। ফলে এই 'সোনার হরিণ' সরকারি চাকরির কদর আরও বেড়েছে। আর তাতেই চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ইঁদুর দৌড়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, বিশেষ করে উন্নত অঞ্চলগুলোতে সরকারি পদের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন প্রার্থীরা। এমনও দেখা গেছে, কাজের চাপ কম কিন্তু ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা ভালো—এমন একটি পদের বিপরীতে লড়ছেন শত শত, এমনকি হাজারো প্রার্থী।
গত বছর মন্ত্রী পর্যায়ের সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে নভেম্বরে। এখন চলছে স্থানীয় পর্যায়ের চাকরির আবেদন প্রক্রিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর মন্ত্রী পর্যায়ের পদের জন্য লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ২৮ লাখ প্রার্থী। গড়ে একটি পদের বিপরীতে লড়েছেন ৭৪ জন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদটিতে প্রতিযোগিতার হার ছিল অকল্পনীয়—একটি পদের বিপরীতে লড়েছেন ৬ হাজার ৪৭০ জনেরও বেশি প্রার্থী!
