সমঝোতা সম্ভব, তবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ‘অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর’: ইরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'শান্তি ও কূটনীতির জন্য প্রস্তুত'। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নানা হুমকি থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক 'এমএস নাউ'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো সামরিক সমাধান নেই। তিনি বলেন, 'একটি কূটনৈতিক সমাধান আমাদের হাতের নাগালে; আমরা সহজেই এটি অর্জন করতে পারি।'
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক উপস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন আরাগচি। বর্তমানে সেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। বিষয়টিকে 'অপ্রয়োজনীয় এবং অকার্যকর' বলে অভিহিত করেন তিনি।
এই শীর্ষ ইরানি কূটনীতিক বলেন, 'আমি গত ২০ বছর ধরে এই পেশায় আছি এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি জানি যে একটি সমঝোতা অর্জন সম্ভব, তবে তা অবশ্যই ন্যায্য এবং উইন-উইন [উভয় পক্ষের জয়] সমাধানের ভিত্তিতে হতে হবে।'
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'সামরিক বিকল্প কেবল বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং এটি কেবল আমাদের জন্য নয়, সম্ভবত পুরো অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি বয়ে আনবে।'
আরাগচির এই সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টা পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়—আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইরানের ওপর সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। জবাবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি মনে করি, আমি বলতে পারি যে আমি এটি বিবেচনা করছি।'
তবে আরাগচি আগেভাগেই সতর্ক করে বলেন যে ইরানিরা 'গর্বিত জাতি', যারা কেবল 'সম্মানের ভাষা' বোঝে। তিনি বলেন, 'আগের মার্কিন প্রশাসন, এমনকি বর্তমান প্রশাসনও আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় সবকিছুই চেষ্টা করেছে—যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, স্ন্যাপব্যাক—সবই; কিন্তু এর কোনোটিই কাজ করেনি।'
গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দফা আলোচনা করেছে। দুই দেশের কর্মকর্তারাই এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের চারপাশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। শুক্রবার বিভিন্ন জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট জানিয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড' জিব্রাল্টার প্রণালী হয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরানের হাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ১০ দিন সময় আছে। পরে তিনি এই সময়সীমা ১৫ দিন পর্যন্ত বাড়ান। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত। ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইরানকে হুমকি দিয়ে আসছেন, যার মধ্যে দেশটিকে 'খুব কঠিন কিছু' এবং 'মর্মান্তিক' পরিণতির হুঁশিয়ারিও রয়েছে।
গত বছরের জুনে ইরানজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় যোগ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা বর্ষণ করেছিল। ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন যে ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি 'বিধ্বস্ত' হয়ে গেছে। গত বছরের শেষ দিকে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পায় যখন ট্রাম্প হুমকি দেন যে ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন করে তবে আবারও হামলা চালানো হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করতে পারেননি এবং দেশটির উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থানও জনসাধারণের কাছে অজানা।
তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তাদের অধিকার হিসেবে দাবি করে আসছে এবং বলছে যে এটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-র লঙ্ঘন নয়। তবে ট্রাম্প এবং তার শীর্ষ সহযোগীরা আগে বলেছিলেন যে তারা চান ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিক।
সাধারণত কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি যদি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়, তবে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। ই
রান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে বলেছে, তারা তাদের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে প্রস্তুত, কিন্তু কর্মসূচিটি পুরোপুরি বাদ দেবে না।
শুক্রবার আরাগচি বলেন, 'মার্কিন পক্ষ শূন্য সমৃদ্ধকরণের (জিরো এনরিচমেন্ট) দাবি জানায়নি।' তার এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য অবস্থানের বিপরীত বলে মনে হচ্ছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরাগচি জানান, ইরান চুক্তির একটি লিখিত প্রস্তাব মার্কিন আলোচকদের কাছে জমা দেবে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ। এরপর দুই পক্ষ চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করতে পারবে।
আরাগচি বলেন, 'আমরা আলোচনার জন্য নির্দেশনামূলক কিছু নীতি এবং একটি সম্ভাব্য চুক্তি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে একমত হয়েছি। আমাদের একটি খসড়া তৈরি করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে আমরা সেই খসড়া নিয়ে আলোচনা শুরু করব এবং আশা করি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।'
