যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাঝেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করল ইরান
লাইভ ফায়ার মহড়ার জন্য মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার মাঝে এ ধরনের পদক্ষেপ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে এবং নতুন কোনো যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
প্রথমবারের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলের পরিবহন পথ। তবে প্রণালীটি সত্যিই বন্ধ হয়েছে কি না তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালীর দিকে লাইভ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে এবং 'নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক উদ্বেগ'-এর কারণে কয়েক ঘণ্টার জন্য এটি বন্ধ থাকবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, 'বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও কখনও এমন ধাক্কা খেতে পারে, যা থেকে সে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।'
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আলোচনার বিষয়ে আশাবাদী জানিয়ে বলেন, 'একটি নতুন সুযোগের জানালা খুলেছে।'
জেনেভায় আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া আরাঘচি জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে বলেন, 'আমরা আশাবাদী যে আলোচনার ফলাফল একটি টেকসই ও সমঝোতামূলক সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে, যা সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং বিস্তৃত অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে।'
আরাঘচি আরও বলেন, ইরান 'প্রত্যেটি হুমকি বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে প্রস্তুত'।
তবে তিনি সামরিক মহড়া বা হরমুজ প্রণালী বন্ধের বিষয়ে বিশেষ কিছু উল্লেখ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলছেন, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করতে চাপ দেওয়ার জন্য তিনি শক্তিও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানও জানিয়েছে তাদের ওপর কোনো হামলা হলে তারাও হামলার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সর্বশেষ পরোক্ষ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওমানি দূতাবাসে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী ওমান গত ৬ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম দফা আলোচনার আয়োজন করে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, তবে অনেক বিস্তারিত বিষয় এখনও আলোচনা বাকি। ইরানি প্রতিনিধিদল আগামী দুই সপ্তাহে আরও বেশকিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করবে, যাতে মতপার্থক্য কমানো যায়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, 'কিছু দিক থেকে আলোচনা ভালো হয়েছে। তবে অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট কিছু উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন, ইরান এখনও এগুলো স্বীকার করতে বা কার্যকরভাবে সমাধান করতে প্রস্তুত নয়।'
মঙ্গলবার ও বুধবার জেনেভায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যেও আলোচনার আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আরাঘচি জানিয়েছেন, জেনেভায় তিনি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। আলোচনায় সংস্থার ভূমিকা নিয়ে সমঝোতা অর্জনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
লাইভ ফায়ার মহড়া
ইরান জানিয়েছে, সোমবার সকালে তার ইসলামী বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে একটি মহড়া শুরু করেছে। এই সব অঞ্চল আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে বিবেচিত। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি হরমুজ প্রণালীতে ইরানের দ্বিতীয় লাইভ ফায়ার মহড়া।
ইসরায়েলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান শেষবার প্রণালী বন্ধ করেছিল, তখন তারা প্রণালীটি মাইনিং করেছিল।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক সমাজকে একটি বার্তা পাঠাচ্ছে যে, ইরানের ওপর যে কোনো আঘাতের প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়বে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শেষ হওয়ার পর তেলের দাম কমেছে। এসময় মার্কিন তেলের মূল্য ১.৩% কমে ব্যারেলপ্রতি ৬২.০৬ ডলারে নেমেছে, আর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ২.৩% কমে ৬৭.০৩ ডলারে অবস্থান করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পর তেলের দাম কয়েক ডলার বেড়েছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি কিছুটা কমেছে। আশা করা হচ্ছে এই দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলে তেলের দাম আরও কমবে।
এদিকে আয়াতুল্লাহ খামেনি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা জোরদার করেছেন।
ইরানি রাষ্ট্র টিভির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, 'অবশ্যই একটি যুদ্ধজাহাজ বিপজ্জনক, কিন্তু যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে এমন অস্ত্র আরও বিপজ্জনক।'
তিনি মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, 'আলোচনার ফলাফল আগেই চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।'
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি
গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। এটি ইতোমধ্যেই তিন সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং তার সঙ্গী গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারদের সঙ্গে যুক্ত হবে।
নৌবাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ও তার তিনটি ডেস্ট্রয়ার বর্তমানে মধ্য আটলান্টিকে অবস্থান করছে।
গত সপ্তাহে ইরানের ড্রোন একটি মার্কিন লিঙ্কন জাহাজের দিকে এগোলে যুক্তরাষ্ট্র সেটি ধ্বংস করে। একই দিন ইরান হরমুজ প্রণালীতে একটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ আটকানোর চেষ্টা করেছিল।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে,ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে আবার আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে, মধ্যপ্রাচ্য এখনও ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের প্রভাব থেকে বেরোতে পারেনি।
ট্রাম্প প্রশাসন মরিয়া হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করার জন্য চুক্তি করতে চাইছে এবং ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না তা নিশ্চিত করতে চাইছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। দেশটি এখন পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি বন্ধ বা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের জোগান হস্তান্তরের দাবি মানতে রাজি হয়নি।
মধ্যবর্তী আলোচনার সময় গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। এর ফলে আলোচনা থেমে যায়। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমা বর্ষণ করে, ওই হামলায় সেসময় সম্ভবত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত অনেক সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়।
