প্রাচীন মিশরীয়দের ব্যবহৃত ৩৫০০ বছর আগের সুগন্ধি ফিরিয়ে আনলেন বিজ্ঞানীরা
মমি কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিসর, পিরামিড আর হাজার বছরের পুরোনো এক রহস্য। এতদিন বিজ্ঞানীরা মমি বা কঙ্কালের ডিএনএ পরীক্ষা করে প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস কিংবা রোগবালাই সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু তাদের ব্যবহার করা সুগন্ধি কেমন ছিল, তা আগে কখনো জানা সম্ভব হয়নি।
অসম্ভব সেই কাজটিই করে দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাড়ে তিন হাজার বছর আগের হারিয়ে যাওয়া সুবাস তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তির জাদুতে আবারও ফিরিয়ে এনেছেন।
কীভাবে সম্ভব হলো?
এর পেছনে মূল চাবিকাঠি ছিল 'ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড' বা ভিওসি নামের বিশেষ একধরনের অণু। গবেষকরা এই অণুগুলো বিশ্লেষণ করার উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা প্রাচীনকালের সুগন্ধির রহস্য উন্মোচন করেছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঘ্রাণ ফিরিয়ে আনার ফলে আমরা শুধু গন্ধই পাচ্ছি না, বরং সেই সময়ের সুগন্ধি শিল্প, চিকিৎসাব্যবস্থা, ধর্মীয় আচার এবং দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে এক স্বচ্ছ ধারণা পাচ্ছি।
গবেষক বারবারা হুবার বিষয়টি সহজ করে বুঝিয়ে বলেন, 'বিজ্ঞান আমাদের রাসায়নিক তথ্য বা সূত্র দেয়। কিন্তু একজন দক্ষ সুগন্ধি প্রস্তুতকারক বা পারফিউমার সেই তথ্যকে বাস্তবে রূপ দেন। এটি কেবল কতগুলো উপাদানের মিশ্রণ নয়, বরং সেই পুরোনো গন্ধের গভীরতা ও আমেজ ফিরিয়ে আনা।'
বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ সুগন্ধিটি তৈরি করেছেন লেডি সেনেটনের ব্যবহৃত পাত্র থেকে পাওয়া নমুনার ওপর ভিত্তি করে। কে ছিলেন এই লেডি সেনেটন? তিনি ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫০ অব্দের মিসরের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজাত নারী। তার মৃত্যুর পর মমি করার সময় চারটি বিশেষ পাত্রে দামী সুগন্ধি বাম বা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং পারফিউমাররা মিলে দীর্ঘ গবেষণার পর সেই সুগন্ধি পুনরুজ্জীবিত করেছেন। প্রতিটি ফর্মুলায় প্রায় ২০টি করে উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু প্রাচীনকালের অনেক উপাদান এখন আর হুবহু পাওয়া যায় না বা বর্তমান সময়ে শরীরের জন্য নিরাপদ নয়, তাই আধুনিক নিরাপদ উপাদান দিয়েই সেই পুরোনো গন্ধের অবিকল প্রতিলিপি তৈরি করা হয়েছে।
এখন আর জাদুঘরে গিয়ে কাচের বাক্সে শুধু মমি দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে না, চাইলে সেই সময়ের গন্ধও শোঁকা যাবে!
জার্মানির হ্যানোভারের অগাস্ট কেস্টনার জাদুঘরে 'সেন্ট অফ দ্য আফটারলাইফ' বা পরকালের সুবাস নামের এক প্রদর্শনী চলছে। সেখানে দর্শকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ 'সুবাসিত কার্ড'। দর্শকরা কার্ডটি নাকে ধরে ৩৫০০ বছর আগের মিসরের রাজকীয় আবহ অনুভব করতে পারছেন।
ডেনমার্কের মোসগার্ড জাদুঘরেও প্রাচীন মিসরীয় প্রদর্শনীতে এমন একটি 'সেন্ট স্টেশন' বা সুগন্ধি বুথ বসানো হয়েছে।
জাদুঘরের কিউরেটররা বলছেন, এই উদ্যোগ মমি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেবে। মমি মানেই যে ভৌতিক সিনেমা বা ভয়ের কিছু নয়, বরং এর পেছনে যে মায়া, মমতা ও পবিত্রতার বিষয় জড়িয়ে ছিল—সুগন্ধির মাধ্যমে দর্শকরা এখন সেটা অনুভব করতে পারছেন।
