আলোচনার টেবিলে কূটনীতিকরা, তবুও ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবারও কড়া অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে তেহরান রাজি না হলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে গত মাসে এই হুমকি দেওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না পেন্টাগনের। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এমন তথ্য জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্থায়ী ঘাঁটিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। কিন্তু ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। ট্রাম্প যে ধরনের বড় অভিযানের কথা বলেছিলেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত যুদ্ধবিমানও তখন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে অবস্থান করছিল।
গত দুই দশকের যুদ্ধ এবং ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানের পর অঞ্চলটি থেকে অনেক সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এ পরিস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে অপেক্ষার পরামর্শ দেন। তারা পেন্টাগনকে সক্ষমতা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সময় দিতে বলেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, 'ইরানের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব বিকল্পই খোলা রয়েছে। তিনি কোনো বিষয়ে বিভিন্ন মতামত শোনেন, তবে দেশের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের জন্য যা সেরা, শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই নেন।'
কূটনীতির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরোধ না মিটলে সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। আর এই সময়ের মধ্যে পেন্টাগন 'আরমাডা' বা বিশাল রণতরি প্রস্তুত করছে, যা ইরানের দিকে যাচ্ছে বলে প্রেসিডেন্ট আগেই জানিয়েছিলেন। এতে যুক্ত হয়েছে গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাবমেরিন। এসব প্লাটফর্ম থেকে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব।
গত তিন সপ্তাহ ধরে ইসরায়েল, আরব দেশগুলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে 'নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেওয়া' হিসেবে উল্লেখ করেন।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, 'মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রস্তুত হওয়ার আগেই তিনি (ট্রাম্প) যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কথা বলে আবার প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়ায় তিনি ইরানকেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে যুদ্ধ আসছে। এতে ইরান তাদের পাল্টা আঘাতের হুমকিগুলো আরও বিশ্বাসযোগ্য করার সময় পেয়ে গেছে।'
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানে হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প লিখেছেন, 'ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমি জোর দিয়েছি, এ ছাড়া চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে একাধিক সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছেন। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতার ওপর হামলা। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট কিছু ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন কমান্ডো মোতায়েনের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পদক্ষেপের আগে পেন্টাগনের আরও সুসংগঠিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। এর অংশ হিসেবে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির (যেখানে গত বছর ইরান হামলা চালিয়েছিল) পাশাপাশি ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, 'আমরা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলো ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে আমেরিকার স্বার্থ বা আমাদের মিত্রদের ওপর অনিবার্য পাল্টা আঘাত এলে আমরা প্রস্তুত থাকতে পারি।'
গত মাসে ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে এবারের সামরিক প্রস্তুতি গত বছরের ভেনেজুয়েলা অভিযানের চেয়েও বড়। দুই পরিস্থিতির মধ্যে মিলও দেখছেন বিশ্লেষকরা। উভয় ক্ষেত্রেই সাগর ও স্থলঘাঁটিতে বিপুলসংখ্যক সেনা ও যুদ্ধসরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে এবং একটি বিমানবাহী রণতরীকে কেন্দ্র করে বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি এবং টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত তিনটি যুদ্ধজাহাজসহ এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। জাহাজগুলো আরব সাগর, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৩ ফেব্রুয়ারি আব্রাহাম লিংকনের কাছাকাছি চলে আসায় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে।
রণতরীটিতে থাকা এফ-৩৫ ও এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার উপযোগী অবস্থানে রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত এফ-১৫ই অ্যাটাক প্লেন মোতায়েন করেছে। আরও চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে বিমানবাহী রণতরি 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড'-কেও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বি-২সহ দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলোকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের অভিযানের আগে সাধারণত রিফুয়েলিং ট্যাংকার ও রাডার জ্যামিং বিমান মোতায়েন বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী গ্রাউলার বিমানও অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতে পাঠানো হয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটায় অতিরিক্ত নজরদারি ও জ্বালানি ভরার বিমান চলাচলের ইঙ্গিত মিলেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নৌবাহিনী যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন আরব সাগরে সরিয়ে নেয়, তবে তা সম্ভাব্য আক্রমণের শক্ত বার্তা হবে। যদিও সাবমেরিনের অবস্থান সাধারণত প্রকাশ করা হয় না, সুয়েজ খাল অতিক্রমের সময় সেগুলো শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, আক্রমণাত্মক সক্ষমতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিও জোরদার করছে পেন্টাগন। অঞ্চলে প্যাট্রিয়ট ও 'থাড' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান কেনেথ এফ ম্যাকেঞ্জি জুনিয়র বলেন, 'ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা আমেরিকার যেকোনো প্রস্তুতিকে গুরুত্বের সঙ্গেই নেবে। কারণ ট্রাম্পের অতীত রেকর্ড—গত জুনে তিনটি ইরানি পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শীর্ষ ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা।'
এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, 'ইরানিরা ট্রাম্পকে ভয় পায় কারণ তিনি সোলাইমানিকে হত্যা করেছেন এবং তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত করেছেন। তিনি সরাসরি অ্যাকশনে যান বলেই তারা তাকে ভয় পায়।'
