‘ম্যানেজমেন্ট নৈতিকতা হারিয়েছে’ দাবি করে গুগল পরিচালকের পদত্যাগ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) সঙ্গে কোম্পানির চুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্য থেকে সরে আসার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন গুগলের একজন পরিচালক।
অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্ম সিকিউরিটির পরিচালক রেনে মায়ারহোফার সম্প্রতি তার ওয়েবসাইটে 'গুগল ম্যানেজমেন্ট হ্যাজ লস্ট ইটস মোরাল কম্পাস' (গুগল ব্যবস্থাপনা পর্ষদ তার নৈতিকতা হারিয়েছে) শিরোনামে একটি নোট শেয়ার করেছেন। সেখানেই তিনি তার পদত্যাগের কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
গত ১৮ মে লেখা এবং গত সপ্তাহে অনলাইনে প্রকাশিত ওই খোলা চিঠিতে মায়ারহোফার বলেন, ২০১৭ সালে গুগলে যোগ দেওয়াটা তার জন্য এমন এক সুযোগ ছিল, যা তিনি চাইলেও ফেরাতে পারতেন না।
তিনি জানান, অ্যান্ড্রয়েড তখন বিশ্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোর একটি ছিল। আর গুগলও তখন পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জন এবং নৈতিক প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হতো।
গুগলে নয় বছর কাটানো এই জ্যেষ্ঠ কর্মী স্মৃতিচারণা করে বলেন, 'বৈশ্বিক পরিসরে কাজ করার জন্য গুগলই ছিল সেরা জায়গা। এখানকার সংস্কৃতি ছিল স্বচ্ছ এবং বিভিন্ন মতামতের জন্য উন্মুক্ত।'
আগে গুগলের সংস্কৃতি ছিল অন্য রকম
মায়ারহোফার বলেন, একসময় গুগলে এমন এক সংস্কৃতি ছিল, যেখানে কর্মীরা নেতৃস্থানীয়দের কোনো সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন এবং কোম্পানির নীতি পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারতেন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, কর্মীদের বিরোধিতার কারণেই গুগল একসময় পেন্টাগন-সম্পর্কিত চুক্তিগুলো বাতিল করেছিল। এ ছাড়া ২০১৮ সালে গুগলের 'এআই নীতিমালায়' সামরিক ও নজরদারিমূলক কাজে এআইয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
মায়ারহোফার বলেন, 'ডোন্ট বি ইভিল (খারাপ কিছু কোরো না) শুধু কোনো স্লোগান ছিল না... কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এটিই দলগুলোকে পথ দেখাত।'
কেন পাল্টে গেল গুগল?
মায়ারহোফারের মতে, যে মূল্যবোধগুলোর কারণে তিনি গুগলে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কোম্পানিটি এখন তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এআই সিস্টেমগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ এনার্জির প্রয়োজন হয়। আর এই কারণেই কোম্পানিটি নীরবে তাদের কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে এসেছে।
তিনি লেখেন, 'এআই মডেলের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণেই গুগল ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নীরবে তাদের কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্যগুলো বাতিল করেছে।'
পেন্টাগনের সঙ্গে চুক্তি
মায়ারহোফার আরও লেখেন, 'এর চেয়েও খারাপ খবর হলো, গুগল ব্যবস্থাপনা পর্ষদ এখন মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের (প্রতিরক্ষা দপ্তর) সঙ্গে চুক্তি সই করছে। অথচ বর্তমান মার্কিন সরকার তাদের "যেকোনো বৈধ উদ্দেশ্যের" নামে আন্তর্জাতিক আইন বারবার লঙ্ঘন করেছে।'
গত এপ্রিলের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করে গুগল। এই চুক্তির আওতায় সামরিক পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা অভিযানসহ সরকারের অতিগোপন (ক্ল্যাসিফায়েড) কাজের জন্য গুগল তাদের এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করবে।
মায়ারহোফার জানান, তার পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে গুগলের এই সংযোগ।
তিনি বলেন, 'আমার নৈতিক ও আদর্শিক জায়গা থেকে আমি কোনোভাবেই—প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে, সরাসরি বা অন্য কোনো উপায়ে—মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারি না। গুগলের শীর্ষ নেতৃত্বের বর্তমান দিকনির্দেশনা এবং সম্প্রতি এই বিষয়ে তাদের আরও জোর পদক্ষেপ নেওয়া দেখে দুর্ভাগ্যবশত পদত্যাগ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।'
নোটিশ পিরিয়ড শেষ করতে এবং চলমান প্রকল্পগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মায়ারহোফার আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গুগলে থাকবেন। গুগল ছাড়ার পর তিনি প্রাইভেসি, এনক্রিপশন, ডিজিটাল আইডেন্টিটি, অপারেটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা এবং এ-সংক্রান্ত গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
